বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তিনবার। রানার্সআপ হওয়াও সমানসংখ্যক। ১৯৩০ সালে যে রানার্সআপ হওয়া শুরু, এর সর্বশেষ সংযোজন হয়েছে ২০১৪ সালে। মাঝে ১৯৯০ সালের ফাইনালেও তারা হেরেছিল। অর্থাৎ ল্যাতিন আমেরিকান দেশটির দখলে তিনটি বিশ্বকাপ ট্রফি এবং তিনবার রানার্সআপ ট্রফি। এই ছয়বার ফাইনালে খেলার সাথে আরেকটি অর্জন আছে আলবিসেলেস্তেদের। তারা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের কোনো সেমিফাইনালেই হারেনি। এবার যুক্তরাষ্ট্রের আটালান্টা স্টেডিয়ামেও কি লিওনেল মেসিদের সেমিতে সেই অজেয় থাকার ধারা অব্যাহত থাকবে? নাকি ১৯৬৬ সালের পর আবার ফাইনালে উঠবে ইংল্যান্ড। সে উত্তরই মিলবে আটলান্টার মাঠে।
১৯৩০ সালের উরুগুয়ে বিশ্বকাপ। সেবার আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বে একে একে চিলি, ফ্রান্স, মেক্সিকোকে হারিয়ে সেমিতে আসে। এরপর সেমিফাইনালে তারা ৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম প্রধান স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। অবশ্য ফাইনালে আর সেই অপরাজিত থাকার ধারাটা ছিল না। উরুগুয়ের কাছে ২-৪-এ হারতে হয়েছিল তাদের।
প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট আর্জেন্টিনা ১৯৩৮, ১৯৫০ এবং ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। তারা প্রত্যাহার করে নেয় নাম। আর ১৯৭০-এ কোয়ালিফাইই করতে ব্যর্থ হয়।
আর্জেন্টিনা প্রথমবার বিশ্বকাপ জয় করে ১৯৭৮ সালে। সেবার আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত আসরে ছিল না সেমিফাইনাল ফরম্যাট। চার দলের গ্রুপ লিগ শেষে প্রতি গ্রুপের দু’টি করে দল দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। আট দলের এই দ্বিতীয় রাউন্ড দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা হেরেছিল ইতালির কাছে। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে তারা কোনো ম্যাচেই হারেনি। পেরুর সাথে ছিল আর্জেন্টিার শেষ ম্যাচ। ওই ম্যাচে বড় ব্যবধানে জিতলেই ফাইনালে। শেষ পর্যন্ত পেরুকে ৬-০তে হারিয়ে ফাইনালে গিয়েছিল লুইস সিজার মেনোত্তির দল। অর্থাৎ পেরুর বিপক্ষে এই ম্যাচকে যদি অঘোষিত সেমিফাইনাল বলা হয়, তাহলে সেই সেমিতেও জয় আর্জেন্টিনার। এরপর ফাইনালে নেদারলান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বসেরা হওয়া।
আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ হাতে নেয়া ১৯৮৬ সালে। মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত আসরে দিয়েগো ম্যারাডোনার দল গ্রুপ পর্ব শেষে দ্বিতীয় রাউন্ডে উরুগুয়ে, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আসে। সেমিতে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বেলজিয়াম। দিয়েগো ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ২-০তে জয় কার্লোস বিলার্দোর দলের। এরপর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে ধরাশায়ী করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কাহিনী।
পরের বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল জিতেছিল। ১৯৯০ সালে ইতালির মাঠে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে তারা ব্র্রাজিলকে, কোয়ার্টার ফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে হারানোর পর সেমিতে পায় ইতালিকে। ইতালিয়ানদেরও হারিয়ে দেয় ম্যারাডোনার দল। তবে তা টাইব্রেকারে। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো এই ম্যাচের টাইব্রেকারেও হিরো ছিলেন গোলরক্ষক সার্জিও গায়কোচিয়া। অবশ্য ফাইনালে তারা পশ্চিম জার্মানির কাছে ০-১ গোলে হেরে শিরোপা খুইয়ে রানার্সআপে সন্তুষ্ট থাকে।
দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ২৮ বছর পর ২০১৪তে আবার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সেমিতে উঠেছিল। ব্রাজিলের মাঠে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে শেষ চারের ম্যাচে আলেসান্দ্রো সাবেলা বাহিনী পেয়েছিল নেদারলান্ডসকে। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডকে ১-০ ও কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামকে ১-০তে হারিয়ে সেমিতে আসা। শেষ চারের এই ম্যাচে অবশ্য লিওনেল মেসিরা গোল করতে পারেননি। আবার তাদের জালে বলও যায়নি। ফলে আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে জয় পায় ডাচদের বিপক্ষে। অবশ্য ফাইনালে আর কুলিয়ে উঠতে পারেনি মেসিরা। গোল মিসের মহড়া দিয়ে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের গোলে জার্মানির কাছে হার।
এরপর ফের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের সেমিতে খেলে কাতারের মাঠে। সেখানে তাদের শেষ চারের বাধা ছিল ক্রোয়েশিয়া। সেবারও সেমিতে আর্জেন্টিনার জয়। ক্রোয়েটদের ৩-০তে হারিয়ে এরপর ফাইনালে ১২০ মিনিটের খেলা ৩-৩ গোলের পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া।
অন্য দিকে সেমিফাইনাল ভাগ্যটা ইংল্যান্ডের ভালো নয়। ১৯৬৬ সালে তারা সেমিতে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছিল পর্তুগালকে। সেই মাচে তাদের জয় ১-০তে। এরপর জার্মানিকে ফাইনালে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড।
বিশ্বকাপ ফুটবলে ইংল্যান্ড মোট তিনবার সেমিতে উঠেছিল। ১৯৬৬ সালের পর ১৯৯০ ও ২০১৮ সালে। দুই আসরেই তাদের সেমিতে বিদায়। ১৯৯০ সালে পশ্চিম জার্মানির কাছে এবং ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হার। ইংল্যান্ড অবশ্য বিশ্বকাপে সাতবার কোয়ার্টার ফাইনালে হেরেছিল।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের দেখা হয়েছিল তিনবার। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে হারিয়েছিল তাদের। ১৯৯৮ সালে দুই দলের সাক্ষাতে ১২০ মিনিটের খেলা ২-২ এ সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয়। এরপর ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ১-০তে হারিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকান দেশটিকে।
দুই দল এখন পর্যন্ত ১৪টি ম্যাচ খেলেছে। এতে ইংল্যান্ডের জয় ছয়টিতে। আর্জেন্টিনার জয় তিনটি। অন্য পাঁচটি ম্যাচ ড্র।



