আবু সালেহ আকন
অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য ধান-চাল-গমের সংগ্রহ মূল্য পরিশোধকালে ২০২৫-২৬ অর্থবছর হতে ০.৫% উৎসে কর কর্তনের বিধান জারি করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে। বিক্রয় মূল্যের উপর কর আরোপ করায় কৃষক ও মিলারদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কর আরোপ করায় কৃষকের ধান-গম বিক্রি ও মিলারদের চাল সরবরাহে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উৎসে কর আরোপের খবরে ইতঃমধ্যেই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাজারভিত্তিক চালের ধরনভেদে মোটা চাল প্রতি কেজিতে ৪ টাকা পর্যন্ত, মিনিকেট মাঝারি সরু চাল প্রতি কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত, মিনিকেট সরু চাল প্রতি কেজিতে ৭ টাকা পর্যন্ত, নাজিরশাইল চাল প্রতি কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। চালের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতঃমধ্যে খাদ্য উপদেষ্টা চলতি মাস হতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ইউনিয়ন পর্যায়ে ৫৫ লাখ পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অসাধু মিলার ও চাল ব্যবসায়ী সিন্ডেকেট উৎসে কর আরোপের বিষয়টি কাজে লাগিয়ে চালের বাজারে বড় রকমের অস্থিতিশীল করার মতলব শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এ দিকে কৃষক ও চালকল মালিকদের পক্ষ থেকে আরোপিত ০.৫% উৎসে কর প্রত্যাহারের জন্য খাদ্য বিভাগ বরাবরে আবেদন করা হয়েছে। খাদ্য অধিদফতর ও খাদ্য মন্ত্রণালয় হতে সংগ্রহ মূল্যের উপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ চিঠি লেখা হয়েছে। কিন্তু কৃষক ও মিলারের উপর আরোপিত ০.৫% উৎসে কর প্রত্যাহারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অসম্মতি জ্ঞাপন করেছে বলে জানা গেছে।
খাদ্য বিভাগের একটি সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য খাদ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাঠ পর্যায়ে অব্যাহত চাপ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে মূলত খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে বাস্তবায়ন করে থাকেন। নতুন করে কর আরোপ, অতি বৃষ্টি, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর হাতে ধানের অবৈধ মজুদ, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অভাব, স্থানীয় নানামুখী চাপ ও জটিলতার কারণে ধান-চালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য অধিদফতরের বিভিন্ন পদ যে ধরনের কাজের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যকদের দিয়ে সংশ্লিষ্ট কাজ করানো হচ্ছে না। কাজের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ না করায় সরকার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ধান-চাল-গমের মূল্য বৃদ্ধি, কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার, শৃংখলা ভঙ্গ, পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, প্রত্যেক উপজেলায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদ রয়েছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাজের ধরন ও প্রকৃতি অনুযায়ী প্রায় ৪০ ধরনের কাজ করতে হয়। সংগ্রহ মৌসুমে ধান-চাল-গম সংগ্রহ কার্যক্রমে উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক সংগৃহীত খাদ্যশস্যের মূল্য পরিশোধ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। সরকার কর্তৃক হতদরিদ্র, তালাকপ্রাপ্তা, অসহায়, গরিব, নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ওএমএস কর্মসূচি, টিসিবি কর্মসূচি, ভিডব্লিউবি, পুষ্টি চাল, কাবিখা, টিআর, জিআরসহ বিভিন্ন রকমের খাদ্যশস্যের বিলি আদেশ (ডিও) উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে দিতে হয়। প্রায় ১০০ উপজেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক না থাকায় সরকারের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানা যায়। খাদ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের প্রত্যেক সংস্থাপনায় উপজেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক/ সমমানের মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে শতভাগ পদায়িত রয়েছে। অন্য দিকে চলমান বোরো ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমে স্থবিরতা ও বাধাগ্রস্ত করে উপজেলা খালি রেখে মাঠপর্যায়ের ১৫ জন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে খাদ্য অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে। কয়েকটি বিভাগীয় খাদ্য অফিসেও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের দিয়ে সংযুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। বিভিন্ন পদের প্রায় ১৫০ জনবল সংযুক্তিতে কাজ করছে। ফলে সরকারের অভ্যন্তরীণভাবে ধান-চাল-গম সংগ্রহের মতো অতি জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ মারাত্মকভাবে বিঘœ ঘটছে। ধান-চাল-গম-আটার বাজার দর ক্রমে বাড়ছে।
সুপারিনটেনডেন্ট ও অডিটরদের কাজ অডিট বা নিরীক্ষা প্রকৃতির হলেও তাদের অফিসের ক্লার্ক ও কম্পিউটার টাইপের কাজে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। মো: মনিরুজ্জামান, অডিট সুপার হলেও বিজ্ঞ আইন উপদেষ্টার দফতরে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে সংযুক্তিতে কাজ করেন এবং অডিট সুপার বাবলু দাস, মো: দিদারুল আলম প্রমুখ সংযুক্তিতে খাদ্য ভবনে উচ্চমান ক্লার্ক ও অফিস ক্লার্কের কাজ করেন। অডিট সুপার কম থাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক অডিট টিম গঠন করা সম্ভব হয় না এবং খাদ্য অধিদফতরাধীন নিরীক্ষা কার্যক্রম সব সংস্থাপনাগুলোতে যথাসময়ে যথাযথভাবে সুসম্পন্ন করতে না পারায় প্রতি বছর সরকার বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
সাইলোর সাইলো অপারেটিভ, সহকারী অপারেটর, অপারেটর, ইলেকট্রিশিয়ানসহ বিভিন্ন পদের প্রায় ৭০ জন টেকনিক্যাল জনবল বিভিন্ন সাধারণ সংস্থাপনায় সংযুক্তি দিয়ে অফিস সহায়ক-দারোয়ান ও ক্লার্কের কাজ করানো হচ্ছে। টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন জনবল খাদ্য ভবনসহ সাধারণ সংস্থাপনায় সংযুক্তিতে থাকায় সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, টেকনিক্যাল জনবলের অভাবে কাজে বিঘœ ঘটে ও টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি দ্রুত বিকল হয়ে যায় বলে জানা গেছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মন্ত্রী, এমপিদের পছন্দের বিভিন্ন পদের জনবল খামখেয়ালি করে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিধাজনক চেয়ারে সংযুক্তিতে পদায়ন করা হয়। কারো কারো বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে সংযুক্তিতে পদায়ন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মো: ফকরুল ইসলাম, শিউলি আক্তার, একরামুল হক ভূঁইয়া, মো: রফিকুল ইসলাম, মকলেচ আলামিন, নাদিরা পারভীন, মো: মনিরুল ইসলাম, মো: দীপ্ত মুৎসুদ্দী, মো: মনিরুজ্জামান, মাছুম বিল্লাহ প্রমুখ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে সংযুক্তিতে পদায়ন পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন, খাদ্যশস্যের দাম বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরার জন্য চালের নিরাপদ মজুদ নিশ্চিত করতে টার্গেট অনুযায়ী চলমান বোরো চাল ও গম কেনার কাজ সফল করার জন্য উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের সংযুক্তি বাতিল করে উপজেলায় পদায়ন করা প্রয়োজন।



