কূটনৈতিক প্রতিবেদক
পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো বর্তমান সরকারের সময়েও অব্যাহত থাকবে। ভারতের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন ছিল। এখন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপি সরকারের সাথে ভারত একটি কার্যকর সম্পর্ক রাখতে চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তিটি ব্যবসা, বিনিয়োগ, সমরাস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটা সত্য হলে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ এবং তা সুরাহার উপায়গুলো নিয়ে আলাপকালে বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো বর্তমান সরকারের সময়েও অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ড. খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। ড. রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সব কাজে যুক্ত ছিলেন, সেগুলো বহাল রাখবেন, এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং সেই প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ বর্তমান সরকারকেও মোকাবেলা করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্কে টানাপড়েন ছিল। এখন যে সব ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বলা যায় বিএনপি সরকারের সাথে ভারত একটি কার্যকর সম্পর্ক রাখতে চায়। ভারতের দিক থেকে বিএনপির প্রতি যথেষ্ট সৌহার্দ্যরে নিদর্শন আমরা দেখেছি। গত ডিসেম্বরে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শোকবার্তা দিয়েছেন, তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছেন, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে খোলা শোক বইতে স্বাক্ষর করেন এবং পরে ভারতের পার্লামেন্টে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। বিএনপি মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা উপস্থিত ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদির চিঠি হস্তান্তর করেন। এ সব ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত করে যে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভালো হবে। অন্তত অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে দেশটির সম্পর্কের যে স্থবিরতা বা টানাপড়েন ছিল, তা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গে মাহফুজুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল অনুমান-নির্ভর। কেন না এই সম্পর্কের বেশ কয়েকটি দিক স্বচ্ছতার অভাবে স্পষ্ট ছিল না। বিশেষ করে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক মোকাবেলায় সমঝোতার বিষয়গুলো বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে আনেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টি পরিষ্কার করেনি। এ কারণে চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে জনমনে একটি সংশয় ছিল। বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নিয়োগ এই সংশয়কে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। কেন না বাণিজ্য উপদেষ্টার পাশাপাশি তিনি এই সমঝোতায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া চুক্তিটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সমরাস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটা সত্য হলে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজ স্বার্থে অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কে একটা দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করবে। চীন থেকে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, পণ্য আমদানি ও প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বাধাগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশে বিদেশী সাহায্যের পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আমাদের সামনে ভালো সুযোগ হচ্ছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরআই) উদ্যোগের আওতায় বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রকল্প সহায়তা গ্রহণ করা। এটা না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্থবিরতা আসতে পারে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাধার মুখে পড়বে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তির সমঝোতার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকলেও তার মধ্য থেকেই সমঝোতা করে আমাদের জন্য লাভজনক উপাদানগুলো বের করে নিয়ে আসতে হতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য রাখতে পারেনি।
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, আমাদের দেশে ভারতবিরোধিতা খুবই লাভজনক পণ্য। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় ভারতবিরোধিতা কিছুটা কমেছে। আমরা চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হেলে পড়ে থাকব না। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের দিকে হেলে নিজেদের, ভারতের এবং আমাদের জন্য জাতীয় সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত ভারতের সাথে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তিনি বলেন, সামনে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন হবে। ভারতে চিকিৎসা নেয়ার জন্য বাংলাদেশীদের ভিসার প্রয়োজন হয়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে দুই দেশেরই স্বার্থ জড়িত রয়েছে। তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমারের সাথে আমাদের একটি পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক প্রয়োজন।
আলতাফ পারভেজ বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতি ভারতের ইতিবাচক আগ্রহের বিষয়টি আমরা দেখছি। নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি ভারতের অনেক মানুষও চায় বাংলাদেশের সাথে একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকুক। কিন্তু এতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সহজ হবে না। উভয় দেশে নানা ধরনের শক্তি আছে যারা এই সম্পর্কটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের নতুন সরকার এই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করবে।



