নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- দুই কোটি লোকের সমাগম ও কঠোর নিরাপত্তায় ৭ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
- তেহরানে স্পিকার হাফিজউদ্দিন ও ইরানি স্পিকার গালিবাফের বৈঠক
- জানাজায় অংশ নিতে তেহরানে ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিদল
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। মৃত্যুর দীর্ঘ চার মাস পর আয়োজিত এই বিদায় অনুষ্ঠানকে দেশটির কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় দাফন কার্যক্রম’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে তার লাশ রাখার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে বিশ্বের প্রায় শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদল এবং লাখ লাখ শোকাতুর মানুষ এখন ইরানে অবস্থান করছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সপ্তাহব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। এ কারণে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় লজিস্টিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পুরো আয়োজনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক শাখা ‘মোহাম্মদ রাসূলুল্লাহ কোর’।
কঠোর নিরাপত্তা ও লজিস্টিক প্রস্তুতি
তীব্র দাবদাহ ও গরমের মাঝেই তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা চত্বরকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয়েছে। মূল প্রবেশদ্বারগুলোতে সশস্ত্রবাহিনীর চৌকস দল মোতায়েন রয়েছে। বিশেষ পাস ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। রাজধানীজুড়ে শোকের প্রতীক হিসেবে কালো এবং প্রতিশোধের বার্তাসংবলিত লাল ও সবুজ রঙের বিশাল ব্যানার টাঙানো হয়েছে। আজ শনিবার তেহরানের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় আগত মানুষের তৃষ্ণা মেটাতে শত শত ট্রাক ভর্তি পানির বোতল সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া শোকাকুল মানুষের সুবিধার্থে ১০ লাখের বেশি আবাসনব্যবস্থা এবং হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব) স্থাপন করা হয়েছে।
৭ দিনের সূচি ও দাফনপ্রক্রিয়া
ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, ৪ ও ৫ জুলাই (শনিবার ও রোববার) তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির লাশ রাখা হবে। আইআরজিসির কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, লাশ একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয়েছে যাতে দর্শনার্থীরা দ্রুত শ্রদ্ধা জানিয়ে চলে যেতে পারেন। ৬ ও ৭ জুলাই (সোমবার ও মঙ্গলবার) কফিন নিয়ে তেহরানে বিশেষ শোকমিছিল হবে এবং এরপর তা শিয়া ইসলামের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র পবিত্র কোম শহরে নেয়া হবে। সেখানে জামকারান মসজিদে জানাজা শেষে ৮ জুলাই (বুধবার) লাশ বিশেষ বিমানে ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানো হবে। শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম পবিত্র স্থান নাজাফ ও কারবালায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন ও বিশেষ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯ জুলাই (বৃহস্পতিবার) লাশ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন খামেনির জন্মশহর মাশহাদের ঐতিহ্যবাহী ইমাম রেজার মাজারের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। দাফনের পর দেশজুড়ে আরো ৪০ দিনের শোক কর্মসূচি চলবে।
বিশ্বনেতাদের উপস্থিতি ও ভূরাজনীতি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদল, পার্লামেন্ট স্পিকার এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছেন। যার মধ্যে অন্তত আটজন সরকারপ্রধান এবং ১২টি দেশের পার্লামেন্ট স্পিকার রয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদও এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ইতোমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন। এ ছাড়া প্রায় ৮০০ আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এই আয়োজন কাভার করছেন। তবে রাশিয়া, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো মিত্র দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও এই তালিকায় সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় (গালফ) অঞ্চলের কোনো দেশের প্রতিনিধি দেখা যায়নি। পাশাপাশি, ইরানের ওপর চলমান সামরিক হামলাকে সমর্থন জানানো পশ্চিমা দেশগুলোকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
স্পিকার হাফিজউদ্দিন ও ইরানি স্পিকারের বৈঠক
ইরানের মরহুম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য ও জানাজায় অংশ নিতে তেহরান পৌঁছেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার তেহরানে তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সাথে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং গভীর শোক প্রকাশ করেন। জাতীয় শোকের এই কঠিন সময়ে তিনি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে ইরানের সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি গভীর সংহতি ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সম্পাদনে ইরানি স্পিকারের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরানে পৌঁছেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সরকারের আমন্ত্রণে প্রতিনিধিদলটি ৩ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সফরে থাকবে এবং খামেনির বিদায়, জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নেবে।
জামায়াতের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রাজশাহী মহানগরী আমির মো: কেরামত আলী, মো: নুরুল আমীন, পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, ডা: এস এম খালিদুজ্জামান ও এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
৪ মাস পর দাফনের কারণ ও ধর্মীয় বিধান
ইসলামী সংস্কৃতিতে মৃত্যুর পরপরই দাফনের নিয়ম থাকলেও খামেনির ক্ষেত্রে ৪ মাসেরও বেশি বিলম্ব হওয়া অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ও অস্বাভাবিক। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং চরম অস্থিতিশীলতার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডক্টর মোহাম্মদ ওমর জানান, খামেনির লাশ ইসলামী শরিয়াহসম্মত উপায়ে কোনো ধরনের রাসায়নিক এমবামিং (লাশ পচনরোধক ব্যবস্থা) ছাড়াই সম্পূর্ণ হিমায়িত শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল। শিয়া আইন অনুযায়ী, যুদ্ধ বা জরুরি পরিস্থিতির মতো ব্যতিক্রমী প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় বিধান মেনে দীর্ঘ সময় লাশ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সমীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, এই শেষকৃত্য কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য প্রদর্শনের একটি বড় মাধ্যম। তবে এই আয়োজনকে ঘিরে এখনো দু’টি বড় রহস্য রয়ে গেছে। প্রথমত, খামেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত ছেলে মোজতবা খামেনি এই অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে উপস্থিত হন কি না। কারণ, যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছিলেন এবং গত ৪ মাস ধরে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, চূড়ান্ত জানাজার নামাজে কে ইমামতি করবেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দু’টি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে খামেনি-পরবর্তী ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ক্ষমতার সমীকরণ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে খামেনির বাসভবনে হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার সাথে নিহত হয়েছিলেন তার মেয়ে, জামাতা ও নাতনি। বিদায় অনুষ্ঠানে তাদের লাশও খামেনির কফিনের পাশে রাখা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দেশবাসীকে এই জানাজায় দলে দলে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, খামেনির শেষ বিদায়ে জনগণের এই ঐতিহাসিক উপস্থিতিই হবে তার হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিশোধ।



