- এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার
- মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে আওয়ামীপন্থীদের বসানোর অভিযোগ
- দফতরে দফতরে গ্রুপিং জিইয়ে রাখার অভিযোগ
প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম দফার রদবদলেই চাকরি হারিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। দায়িত্ব পালনের সময় সার আমদানিতে সিন্ডিকেট তৈরি, তিন মৌসুমে বাড়তি দামে সার বিক্রি, গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের বসানো, চলমান প্রকল্প বন্ধ করে সরবরাহকারীদের সুবিধা দেয়া এবং ভুল সিদ্ধান্তে হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগসহ নানা কারণে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় গত রোববার। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনকালে কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধিনস্থ সংস্থা/প্রতিষ্ঠানগুলোতে তৈরি হয় আলাদা বলয়। যেটিকে অনেকে ‘মিয়ান সিন্ডিকেট’ নামেও অভিহিত করছেন। তিনি বিদায় নিলেও কৃষির সর্বত্র এখন এই সিন্ডিকেট বিরাজমান। এখন তারা আতঙ্কে রয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এই কর্মকর্তা কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই অধিনস্থ দফতরগুলো পরিচালনায় অদক্ষতা, ভুলনীতি গ্রহণ, দফতরগুলোতে কর্মকর্তাদের মধ্যে দলাদলি তৈরি করা, সিন্ডিকেট ভাঙার বয়ান দিয়ে নতুন সিন্ডিকেট তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ করা, অদক্ষ কর্মকর্তাকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব প্রদানের মত কাজগুলো করেছেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম নামমাত্র কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও সচিবের মতের বাইরে যেতেন না।
এসব কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একাধিকবার এই সচিবকে সরিয়ে দেয়ার বিষয় নিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা ছিল। কিন্তু একাধিক উপদেষ্টার সুপারিশের কল্যাণে তাকে চেয়ার ছাড়তে হয়নি। বরং সে সময়গুলোতে আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেন এ কর্মকর্তা। এবারো নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নানাভাবে চেষ্টা করছিলেন চেয়ার রক্ষার; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ এর ১৪ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যোগদান করেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। এর পরপরই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা পাঠানো হয় সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে। চিঠিতে বলা হয়, কিছু কর্মচারীর প্রাধিকার বহির্ভূত গাড়ি ব্যবহারের কারণে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক অপচয়ের কারণ ঘটছে। অন্য দিকে নৈতিকতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে সমাজে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে সংস্থাগুলোর গাড়ি ব্যবহার না করতে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। কিন্তু এখান থেকেই নির্দেশনা অমান্য করা শুরু করেছিলেন সাবেক এই সচিব। সরকারের বরাদ্দ করা গাড়ি নিজে ব্যবহার না করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের একটি জিপ গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৩০৩৬ নম্বরের গাড়িটিতে চড়ে শেষদিনও অফিস করেছেন এই কর্মকর্তা।
জানা যায়, তিনি সচিব হিসেবে যোগদানের মাস তিনেক পরই শুরু হয় বোরো মৌসুম। সে সময় সারের সরবরাহ সঙ্কটের অভিযোগ ওঠে। সারা দেশের কৃষককে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ইউরিয়া-নন ইউরিয়া সার কিনতে হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তিনি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। শুধু মিডিয়াতে বলেছেন, সারের কোনো সঙ্কট নেই। শুধু সেই বোরো মৌসুমই নয়, এর পরের আমন এবং এবং চলতি বোরো মৌসুমেও একইভাবে কৃষক বেশি দাম দিয়ে সার কিনছেন। অথচ তিনি সারের দাম কমানোর বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
সারের বেশি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলতেন, ‘নতুন ডিলারশিপ নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হলে সারের দামে অস্থিরতা থাকবে না।’ কিন্তু তিনি সংশ্লিষ্ট ডিলারদের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই এই নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। ডিলারদের দাবি ছিল, যাতে নীতিমালাটি বাস্তবায়ন করা হয় মৌসুম শেষে। কিন্তু তিনি জোর করে এই বোরো মৌসুমের ভেতরেই নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। ডিলারদের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতার একটা প্রভাব পড়েছে সারের দামে। একইসাথে একটা সিন্ডিকেটকে নতুন ডিলারশিপ দেয়ার নামে টাকা কামানোর সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক এই সচিব গত আমন মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে সারের সরবরাহ সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। প্রতি বছর যে সময়ে নন ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়, তারও দুই মাস পরে সাড়ে ৯ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির দরপত্র দিয়েছিলেন। আবার দরপত্র দিলেও সব আয়োজন ছিল পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে একচেটিয়া আমদানির সুযোগ দেয়া। শুধু সময় ক্ষেপণই নয়, ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠে সিন্ডিকেট তৈরির অভিযোগ। কারণ একজন ব্যবসায়ীকে একই কার্যাদেশে দু’টি দেশ থেকে সার আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়- যা ছিল নীতিমালার পরিপন্থী। সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বললেও বাল্ক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে এককভাবে ৪০ শতাংশের বেশি সার আমদানির সুযোগ দিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, এক দিকে সিন্ডিকেট করে একজনকে বেশি আমদানির সুযোগ দেয়া এবং নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যাতে করে মৌসুমে সার সঙ্কটের শঙ্কা তৈরি হয়। এ ছাড়া দেরিতে সার আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামও বৃদ্ধি পায়। ফলে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, একটা সিন্ডিকেট তৈরির জন্য সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ উইংটি সচিব নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের বসিয়েছিলেন। সচিব নিজেই বঙ্গবন্ধু জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই উইংয়ের কর্মকর্তা পছন্দের ক্ষেত্রেও আওয়ামী ঘনিষ্ঠতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন, তা-ও আবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও। যে কারণে অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমামকে এই উইংয়ের প্রধান করেন, যিনি সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব ছিলেন। এ ছাড়া এ বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে দায়িত্বে নিয়ে আসা হয় খোরশেদ আলমকে, যিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভৈরবের ইউএনও এবং নাজমুল হাসান পাপনের ঘনিষ্ঠ বলে প্রশাসনে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের একান্ত সচিব মনিরুজ্জামনকেও এই বিভাগে নিয়ে আসেন তিনি।
আওয়ামী সরকারের পতনের পর সারা দেশের মতোই সরকারের বিভিন্ন দফতর ও সংস্থাগুলোতে ব্যাপক অস্থিরতা চলছিল। অস্থিরতা কমাতে পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক গ্রুপ তৈরি করেন। একটিকে আরেকটির পেছনে লাগিয়ে রাখতেন নিজের সুবিধার জন্য। যা আদতে কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের কর্মবিমুখ পরিবেশ তৈরিতে সহযোগিতা করেছে।
এ ছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের নতুন পরিচালক নিয়োগ দিয়েও বরাদ্দে ৫২৮ কোটি টাকা ব্যবহার করতে দেননি। প্রকল্পটি বন্ধের দারপ্রান্তে নিয়ে আসা হয়েছে যেসব সরবরাহকারী অনিয়ম করেছেন তাদেরকে বাঁচানোর জন্য। চলমান একটি প্রকল্প বন্ধ করে সেখানে পরিচালককে চাপ দিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প তৈরির জন্য চাপ দিতেন এই সচিব।
একইভাবে অনিয়ম ও অদক্ষতার ব্যাপক অভিযোগ থাকার পরও তিনি যোগদানের পর ডিএই এর পার্টনার প্রকল্পের তৎকালীন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মিজানুর রহমানকে দায়িত্বে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে এই কর্মকর্তা সারা দেশের প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ডিএই তে নগদ টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ায় তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয় নিজের এলাকা গাজীপুরের আবুল কালাম আজাদকে। এই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালেও প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে জানা যায়।
জানা গেছে, সচিবের ভুল তথ্যের কারণে চলতি মৌসুমের আগে পেঁয়াজের দাম ৭০-৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০-১৩০ টাকায় উঠেছিল। কারণ তিনি পেঁয়াজের মজুদ পর্যাপ্ত থাকার কথা বলে আমদানির অনুমতি বন্ধ রেখেছিলেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই চাল, গম, ভুট্টা, আলুসহ ৮টি কৃষি পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনের তথ্য প্রস্তুতের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন না করে ফাইলবন্দী করে রেখেছিলেন এই সচিব। সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এটি বাস্তবায়ন করতে পারেননি বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে এসে এই কর্মকর্তা অগামী ২০৫০ সাল পর্যন্ত বছরের কৃষি নিয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন। কিন্তু পরিকল্পনাটি তিনি এতটাই তড়িঘড়ি করে তৈরি করেন যেখানে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই আদতে পরিকল্পনা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এর পুরো দায়িত্ব দিয়েছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পিপিসি উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো: মাহমুদুর রহমানকে। তিনি শুধু এই দায়িত্বই নয়, মন্ত্রণালয়ে সচিবকে সব ধরনের পরামর্শ প্রদান করতেন বলেও জানা গেছে।
কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট এক সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, গোঁজামিল দিয়ে ২৫ বছরের যে পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর তিনি এই পরিকল্পনা এবং কৃষক কার্ডকে টার্মকার্ড হিসেবে নিয়ে চেয়ার রক্ষার মিশনে নেমেছিলেন। কিন্তু সেই মিশন আর সাকসেস হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং অধিভুক্ত সংস্থা/দফতরগুলোতে গত প্রায় দেড় বছরে নিজের বলয় তৈরি করেন এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই), মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ডিজিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ও নিজের বলয়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একক কর্তা ব্যক্তিতে রূপ নেন মিয়ান। তার বিদায়ের পর এসব কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিদায়ের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।



