যুদ্ধবিরতি বাড়াতে রাজি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

মার্কিন রণতরিতে চরম বিশৃঙ্খলা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৭ সেনার

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মেয়াদ ফুরনোর পাঁচ দিন আগেই ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়াতে একমত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় এই সিদ্ধান্ত হলেও নতুন করে কতদিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি কোনো পক্ষই। গতকাল বুধবার তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদোলু-কে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে পাকিস্তানের সরকারি সূত্র। মধ্যস্থতার প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশই তাদের সম্মতির কথা মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়ে দিয়েছে। তবে ঠিক কতদিনের জন্য এই বিরতি বাড়ানো হবে, তা ঠিক করতে এখনো উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা বিনিময় চলছে। আগামী ১৭ আগস্ট এই চলতি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।

এর আগে, গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ওয়াশিংটন ও তেহরান। পরবর্তীতে গত ১৭ জুন তারা একটি সমঝোতা স্মারকে সইও করে, যার লক্ষ্য ছিল একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু কিছুদিন যেতেই নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’-তে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে দুই দেশের মতবিরোধ তৈরি হয়। ফলে আলোচনা থমকে দাঁড়ায়। আলোচনা অচল হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত সঙ্ঘাতের দিকে মোড় নেয়। গত ৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় সামরিক হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালে তার কঠোর জবাব দেয় তেহরান। জর্দান, বাহরাইন ও কুয়েতসহ কয়েকটি আরব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও সরঞ্জাম লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা পরিচালনা করে ইরান। বর্তমানে নতুন করে সঙ্ঘাত এড়াতে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিরতি বাড়াতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার জটিল সমীকরণ কিভাবে সমাধান হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মার্কিন রণতরীতে চরম বিশৃঙ্খলা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ গেল ৭ সেনার

এদিকে ইরানবিরোধী দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে টানা সাগরে অবস্থান করা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এ সেনাসদস্যদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। দিনের পর দিন সাগরে মোতায়েন থাকা নিয়ে নাবিকদের তীব্র মানসিক চাপ ও ক্ষোভের জেরে জাহাজের ভেতরেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন কর্মীরা। ধারালো অস্ত্র ও ছুরিকাঘাতে শেষ হওয়া এই সংঘর্ষে অন্তত সাতজন মার্কিন নৌসেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সফরকালে সেনাসদস্যদের একাংশের অসন্তোষ প্রকাশ পাওয়ার পর এই নজিরবিহীন সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে এক সামরিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে, দীর্ঘ দিনের দীর্ঘায়িত মোতায়েন নিয়ে মার্কিন নৌসেনাদের পরিবারের তরফ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নাবিকদের ক্ষোভ প্রশমন করতে সেন্টকমের প্রধান ব্র্যাড কুপারের এক উপদেষ্টা পারমাণবিক শক্তিচালিত এই রণতরীতে যান। তবে ব্রিফিং চলাকালে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ওই উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া ধ্বনি দেন ও ভীতি প্রদর্শন করেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ নাবিকরা তাকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছুড়ে মারলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্রু সদস্যদের নিজেদের মধ্যেই হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে এই সঙ্ঘাত সহিংস রূপ নেয় এবং নাবিকরা একে অপরের ওপর ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে ঘটনাস্থলেই সাতজন নৌসেনা প্রাণ হারান এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।

এই ঘটনার পর বর্তমানে বিমানবাহী ওই রণতরীটির ভেতরে অত্যন্ত থমথমে, উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত পরিবেশ বিরাজ করছে বলে সামরিক সূত্রে জানা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ দীর্ঘ ২৬৩ দিন ধরে মোতায়েন রয়েছে এবং বর্তমানে এটি ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে। আধুনিক যুগে কোনো মার্কিন রণতরীর এটাই সবচেয়ে দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন মোতায়েন, যার মধ্যে গত জুলাই মাসে ওমানে একটি স্বল্পমেয়াদি বিরতি ছাড়া টানা ২০৮ দিন এটি সম্পূর্ণ সাগরেই অবস্থান করছে। মূলত ইরানের ওপর একটি অবৈধ নৌ-অবরোধ কার্যকর করার সামরিক মিশন পালনেই দীর্ঘ সময় ধরে এই রণতরীটিকে সেখানে নিয়োজিত রাখা হয়েছে, যা এখন সেনাসদস্যদের ভেতরে চরম মানসিক বিপর্যয় ও সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে।

স্থগিত আলোচনা ফের চালুর উদ্যোগ পাকিস্তানের

যুদ্ধ থামাতে সরাসরি আলোচনায় বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে। থমকে যাওয়া সেই বৈঠক ফের চালু করতে আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই কথা নিশ্চিত করেছে। ইসলামাবাদে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দোরাবি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আবার সমঝোতার টেবিলে ফেরাতে ইসলামাবাদের তৈরি খসড়া স্মারকের ভিত্তিতে তারা কাজ করছেন। অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এর মূল লক্ষ্য। অন্যান্য ‘ভাইয়ের মতো ঘনিষ্ঠ’ দেশগুলোকে সাথে নিয়ে সঙ্কট সমাধানের এই আন্তরিক চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে। একইসাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে এই আলোচনা এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

এই মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি মঙ্গলবার ইরান সফরে গিয়েছেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। মূলত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও থমকে যাওয়া মার্কিন-ইরান সংলাপ কিভাবে চালু করা যায় তা নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসীম মুনিরও সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।

গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বিশ্ব জ্বালানি ও বাণিজ্য পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’তে অবাধে জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিয়ে দ্বিমত দেখা দেয়। ফলে নস্যাৎ হয়ে যায় সেই আলোচনা। এরপরই পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত ৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাইয়ের মধ্যে দুই দেশ একে অপরের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে হামলা চালায়, যার জবাবে ইরানও জর্দান, বাহরাইন ও কুয়েতের মতো কয়েকটি আরব দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাটি ও সরঞ্জাম লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। সেই চরম উত্তেজনা কমানোই এখন পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য।

ইরানের সাথে সবকিছু ‘ভালোভাবেই এগোচ্ছে’ জানিয়ে হরমুজ প্রণালীর ওপর মার্কিন বাহিনীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের প্রিন্স জর্জেস কাউন্টির সামরিক ঘাঁটি জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানের সাথে সবকিছু ভালোভাবেই চলছে, একেবারে দারুণভাবে চলছে। হরমুজ প্রণালীর ওপর আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে; অন্য কারো হাতে নয়, শুধু আমাদের। আমাদের নৌবাহিনী অবিশ্বাস্য রকমের শক্তিশালী, আর আমাদের দেশের জন্য সবকিছুই খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।’ ট্রাম্প আরো বলেন, ‘আমি ইরানকে বিশ্বাস করি না। ইরানকে বিশ্বাস করবে, এমন সর্বশেষ ব্যক্তি হব আমি। তারা আমাকে বারবার মিথ্যা বলেছে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে; তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- উভয় দেশই হরমুজ প্রণালী ঘিরে সঙ্ঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন এক সূত্র। হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল পরিবহন পথটি আবার উন্মুক্ত হতে পারে এবং প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এ অস্থিরতার অবসান ঘটতে পারে। বর্তমানে ওমান ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা চলছে। ওমানের ভৌগোলিক অবস্থান প্রণালীটির ঠিক বিপরীত পাশে হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

আলোচনার মধ্যে ২ সাগরে জাহাজে হামলা

ইরান যুদ্ধ অবসানের সমঝোতা প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার মধ্যে লোহিত সাগর ও ওমান সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে নতুন করে পৃথক হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন তাদের শর্ত না মানা পর্যন্ত জ্বালানি পরিবহনের কৌশলগত পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান দু’টি রুট, হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখের ওমান উপসাগর এবং লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধবিরতি চুক্তির আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সঙ্ঘাত থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে।

বুধবার লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাবুল-মান্দেব প্রণালীতে মিসরের মালিকানাধীন ‘তিহামা’ নামের একটি ছোট মালবাহী জাহাজে সন্দেহভাজন হাউছি হামলায় চারজন ক্রু সদস্য নিহত হয়। এ সময় উদ্ধারকাজে আসা হাউছি-বিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর দুই ইয়েমেনি কোস্ট গার্ড সদস্যও প্রাণ হারান। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক নৌপথে হাউছিদের হামলায় এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা। হাউছি নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা সাবা জানায়, তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।