ডিজেলের বিদ্যুতে চলছে ওষুধ শিল্প

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ৬০ শতাংশ এখন তৈরি হয় না

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডিজেলের বিদ্যুতে চলতে বাধ্য হচ্ছে ওষুধ শিল্প। ১৫ টাকায় প্রতি ইউনিটের সরকারি বিদ্যুৎ সব সময় থাকে না। কিন্তু ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। বাধ্য হয়ে তাদেরকে নির্ভর করতে হয় ডিজেলের ওপর। আর ডিজেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ পড়ে প্রতি ইউনিটে ৪২ টাকা। উচ্চ খরচের কারণে এবং অব্যাহত লোকসানের কারণে অত্যাবশ্যকীয় তালিকার অনেক ওষুধ এখন উৎপাদন হয় না। বর্তমানে কার্যকর অত্যাবশ্যকীয় তালিকার ১১৭টি ওষুধের মধ্যে ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি) বলছে, প্রতি দুই বছর পরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণের শর্ত থাকলেও ১৯৯৪ সালের সর্বশেষ তালিকা হওয়ার পর মূল্য নির্ধারণ হয়েছে মাত্র দু’বার। নানা কারণে বর্তমানে ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদনই হয় না। বাজারে পাওয়া যায় বাকি ৪০ শতাংশ অত্যাবশ্যক তালিকার ওষুধ। এর মধ্যে আবার ১৯টি কোম্পানি কোনো নিবন্ধনই নেয়নি, তাদের ওষুধও পাওয়া যায় না। আবার এর মধ্যে ডলারের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ, ফলে বিদেশ থেকে এপিআই আমদানি মূল্যও বেড়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বাপি কার্যালয়ে আয়োজিত বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সাথে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশের ওষুধ, দামবিষয়ক ‘ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি : চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় বাপি নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ের ওপর কথা বলছিলেন।

সভায় বাপির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: মো: জাকির হোসেন বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়, তার বড় একটি অংশ এসেনশিয়াল ড্র্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামও ‘এসেনসিয়াল ড্রাগস’। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানটিকেই দেয়া যেতে পারে। ডা: জাকির বলেন, ইডিসিএল সরকার থেকে বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা পেয়ে থাকে। সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন কারখানাও রয়েছে। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা ও অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশি। বাপির বর্তমান মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, সময়ের চাহিদা ও বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজন বিবেচনায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। আমরা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির বিপক্ষে নই। তবে আমাদের দাবি, তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে সব খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেয়া প্রয়োজন। একই সাথে তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর মান নিশ্চিত করে সেগুলো জনগণের নাগালের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা বেশ কষ্টসাধ্য। ১৯৯৪ সালে প্রণীত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার মধ্যে বর্তমানে খুব অল্পসংখ্যক ওষুধ নিয়মিত উৎপাদিত হচ্ছে। অনেক ওষুধ উৎপাদন করা বেসরকারি কোম্পানির জন্য অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, সম্ভব হলে এসব ওষুধ ইডিসিএলের মাধ্যমে উৎপাদন করে জনগণের কাছে সুলভমূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করতে পারে। এতে একদিকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য এসব ওষুধ সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।

সভায় বাপির সিনিয়র সহসভাপতি ও ইউনিমেড ইউনিহেলথের চেয়ারম্যান মো: মোসাদ্দেক হোসেন বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশই ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ সেই অল্পসংখ্যক দেশগুলোর একটি। দেশের ওষুধশিল্প শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করে রফতানি করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিযোগী ভারত। তারা নিজেরা অনেক এপিআই উৎপাদন ও ব্যবহার করে বলে তাদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা হচ্ছে। মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, দেশের ওষুধশিল্প কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই সুযোগে বিদেশী কোম্পানিগুলো দেশের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে নিতে পারে। দেশীয় ওষুধ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা ঠিক হবে না। ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।

মতবিনিময় সভায় বিএইচআরএফের জেনারেল সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ বলেন, ওষুধ খাতের বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অংশীজনের সাথে আলোচনা করতে চাই আমরা। সঙ্কটের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করা গেলে এর সমাধানের পথও বের করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, সরকার, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবা খাতের ব্যক্তিবর্গ এবং সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের ওষুধ শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করা সম্ভব হবে।