আলজাজিরা
আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ১৫ দফার গাজা শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, হামাসকে পুরোপুরি অস্ত্র মুক্ত না করা পর্যন্ত গাজা ভূখণ্ড থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করবে না তেলআবিব।
এর আগে ওয়াশিংটন যুদ্ধ অবসানের লক্ষে এক অগ্রগতির কথা জানায়, যাতে গত বছর ইসরাইল ও হামাস উভয়েই সম্মতি জানিয়েছিল এবং প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটেছিল। তবে গত অক্টোবরে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরেও গাজায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে ইসরাইল। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে দীর্ঘদিন গাজার প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা হামাস অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) অবস্থান তুলে ধরে নেতানিয়াহু বলেন, ১৫ দফার এই খসড়া প্রস্তাবটি ইসরাইল বর্জন করছে। হামাসকে নিশ্চিতভাবে নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করা হবে না এবং নাগরিকদের ওপর হুমকি মোকাবেলায় তাদের সামরিক উপস্থিতি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।
অন্য দিকে হামাস জানায়, তারা আমেরিকান সমর্থনপুষ্ট এই পরিকল্পনা অনুসরণে প্রস্তুত এবং এটি কার্যকর করতে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির তাগিদ দেয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের শান্তি প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়েছে যে, তারা পরিকল্পনার চূড়ান্ত পর্যায় মেনে চলতে সম্মত; যার অধীনে হামাসের সশস্ত্র সদস্যরা তাদের সমরাস্ত্র ফিলিস্তিনিদের নতুন গঠিত প্রশাসনিক কমিটির কাছে হস্তান্তরে রাজি।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে হামাসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তেলআবিবের অনুমোদন পাওয়া এবং চুক্তি বাস্তবায়ন শুরুর শর্তে তারা পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে প্রস্তুত বলে মধ্যস্থতাকারীদের অবহিত করেছেন। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে গাজায় চলমান ইসরাইলি সামরিক তৎপরতার তীব্র নিন্দা জানায়। ওই বিবৃতিতে সতর্ক করা হয় যে, ইসরাইলের এই অবস্থান সঙ্ঘাত নিরসনে ট্রাম্পের শান্তি রূপরেখাকে সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ‘রেড লাইন’- মিসর
গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যেকোনো পরিকল্পনাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে দেখছে মিসর। এমন উদ্যোগ প্রতিহত করতে দেশটি পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যেকোনো অপচেষ্টাকে আরব ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াফাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আবদেলআতি বলেন, গাজায় যদি জীবনযাপন অসম্ভব করে তোলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, তবে সেখানকার বাসিন্দাদের ‘স্বেচ্ছায় বাস্তুচ্যুতি’কে কোনোভাবেই স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ বলা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে বাসিন্দাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করাটা চরম জবরদস্তির শামিল, যা আন্তর্জাতিক আইন এবং দখলদারিত্বের অধীনে থাকা মানুষের অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, মিসর এ ধরনের বাস্তুচ্যুতি মেনে নেবে না এবং হতেও দেবে না। ফিলিস্তিনিরা যেন নিজেদের মাতৃভূমিতেই শক্তভাবে টিকে থাকতে পারে, সে বিষয়ে মিসরের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
অধিকৃত পশ্চিমতীরের পরিস্থিতি নিয়েও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন আবদেলআতি। ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘নীরব দখলদারিত্ব’ ও ‘কার্যত সংযুক্তিকরণ’ বলে বর্ণনা করেন।
মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সামরিক শক্তির ব্যবহার যত তীব্রই হোক না কেন, ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকারকে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত ইসরাইল বা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অর্জন কখনোই সম্ভব হবে না।
‘কাগজে যুদ্ধবিরতি, বাস্তবে নয়’- জাতিসঙ্ঘ
এ দিকে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক দফতরের প্রধান আজিত সুনঘে বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় বোমাবর্ষণ, নৌ হামলা ও গুলিতে প্রায় এক হাজার ১৫০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক। তিনি আরো বলেন, গাজার মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার রয়েছে এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণরেখা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রায় এক হাজার দিনের যুদ্ধের পরও মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটপূর্ণ।



