পর্যটকদের জন্য দেশ ভ্রমণে ব্যয় বাড়লেও সুবিধা বাড়েনি। এ নিয়ে প্রতিবছর ভ্রমণকারী ভুক্তভোগী পর্যটকদের অভিযোগ বাড়লেও সেবার মান উন্নত হয়নি। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যাতায়াতে রাস্তার বেহালদশা, নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের টিকিটও এখন বেশ ব্যয়বহুল। সে সাথে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাস, ট্রেন এবং লঞ্চের ভাড়া আগের তুলনায় বেড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় হোটেল এবং রিসোর্টগুলো তাদের রুম ভাড়া এবং সার্ভিস চার্জ বাড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধিতে পর্যটন এলাকায় রেস্তোরাঁ ও হোটেলের খাবারের খরচও বেড়েছে। এতে করে দেশে পর্যটকদের ব্যয় কয়েকগুণ বাড়লেও সুযোগ-সুবিধা একেবারে তলানিতে।
ট্যুর অপারেটররা বলছেন, এনবিআরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ পথে বিমানযাত্রায় আবগারি শুল্ক ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে, যা বিমান টিকিটের দামের সাথে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। এ ছাড়া রেস্তোরাঁসহ শতাধিক পণ্য ও সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর কারণে খাবারে ব্যয় বেড়েছে।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ দশ মাস নিষেধাজ্ঞার পর চলতি ডিসেম্বরের শুরু থেকে পর্যটকদের জন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে রাত যাপনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। এতে ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিলেও বাস্তবে যাতায়াত খরচ এবং ভোগান্তি বেড়েছে কয়েক গুণ।
পর্যটকদের অভিযোগ, এখন কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনে আসা-যাওয়ার সর্বনিম্ন ভাড়া দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজার টাকা, যা আগে টেকনাফ থেকে মাত্র এক হাজার থেকে বারো শ টাকার মধ্যে ছিল। খরচের পাশাপাশি যাত্রার সময়ও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এ ছাড়া আগে টেকনাফ থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় দ্বীপে পৌঁছানো গেলেও এখন কক্সবাজার থেকে জাহাজযোগে যেতে সময় লাগছে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা। ফলে পর্যটকদের দীর্ঘ সময় জাহাজে বসেই পার করে দিতে হচ্ছে, যা অনেকের জন্য ক্লান্তিকর হয়ে উঠছে।
যাতায়াতের এ সমস্যার পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে টিকিটের তীব্র সঙ্কট। তারা বলেন, অন্তত বিশ দিন আগে টিকিট বুক না করলে এখন সেন্টমার্টিন যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সেন্টমার্টিন জেটিঘাটের চরম অব্যবস্থাপনা পর্যটকদের আনন্দের যাত্রাকে আতঙ্কে রূপ দিচ্ছে। এতো কষ্টের পরও যাতায়াতটা স্বস্তিদায়ক হয় না। নানান কারণে আনন্দের পরিবর্তে তা বিড়ম্বনায় পরিণত হয়।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর সচিব নিজাম উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিদেশী পর্যটক না আসলে এ খাতের কাক্সিক্ষত লক্ষ পূরণ হবে না। যেহেতু বাংলাদেশ এখনো অনেক দেশের লাল তালিকায় রয়েছে তাই পর্যটক আসছেন না। তা ছাড়া ভিসা জটিলতায়ও পর্যটক প্রতিকুলতায় রয়েছেন। তার ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পরিবহন খরচ। ফলে এক গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যে আগের তুলনায় ভ্রমণকারীদের অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। বর্ধিত ভাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর চাপ বাড়ে এবং পরিবহনের খরচ মেটাতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ ছাড়া শুল্ক ও বৃদ্ধি বিদ্যুতের দাম বাড়তে হোটেল মোটেলেও রুম ভাড়া বেড়েছে। রেস্তোরাঁয় বেড়েছে খাদ্যের দাম। যার সবই ভ্রমণকারীদের পকেট কেটে নেয়া হচ্ছে। এতো কিছুর পরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না।
এ বিষয়ে সিলেট হোটেল মোটেল সমিতির একজন নেতা জানান, ঢাকা সিলেট মহাসড়কসহ আঞ্চলিক বেহাল সড়ক এবং সার্বিক অনিশ্চয়তায় পর্যটন ব্যবসা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে উদ্যোক্তারা। তার ভাষ্য, যাতায়াতে রাস্তার দুরবস্থায় এখানে যাতায়াতে ভ্রমণকারীদের বড়ো ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। সে সাথে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। ফলে অতিরিক্ত টাকা দিয়েও নিরাপদ ভ্রমণ সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আগে প্রতিদিন ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ছুটে যেতেন পর্যটকরা। শীত মৌসুমে যেখানে পর্যটকের ভিড় থাকতো চোখে পড়ার মতো, সেখানে এবার দৃশ্য ভিন্ন। নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা শঙ্কা, মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দুরবস্থা এবং সাম্প্রতিক সাদাপাথর কাণ্ড; সব মিলিয়ে দিশেহারা পর্যটন শিল্প।
বিরাজমান অবস্থায় ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরাইশী নয়া দিগন্তকে বলেন, পর্যটন খাত স্থিতিশীল হতে সময় লাগবে। কারণ এর অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দেশীয় বিমানব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, প্রচারের অভাব, নিরাপত্তা ও বিদেশী পর্যটকদের কাছে সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বড় বিষয়। তিনি বলেন, উন্নত সেবা ও তথ্যের অভাব যেমন রয়েছে তেমনি পর্যটকের জন্য বাড়তি খরচ একটি বড়ো বোঝা। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী পর্যটন বাজারের ৫৩ শতাংশ আসে আমেরিকা এবং ইউরোপ থেকে; যা থেকে আমরা অনেকটাই বঞ্চিত। এসব সমস্যার সমাধান না হলে এর উন্নয়ন অসম্ভব। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে গেলে তা আন্তর্জাতিক মানে উন্নিত করা খুব কঠিন হবে না।



