দেশের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘ এক মাসের নেতৃত্বশূন্যতার পর সরকার গত রোববার ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্ব দেয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর ওই দিন রাত থেকে গতকাল সোমবার দিনভর গাজীপুরস্থ ব্রি ক্যাম্পাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বিক্ষোভ করেছেন। তারা মূল গেটসহ কর্মকর্তাদের রুম ও গবেষণাগারেও তালা ঝুলিয়ে দেন। অন্য দিকে, নতুন ডিজিকে স্বাগত জানিয়ে পাল্টা শোডাউনও করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরেকটি অংশ। এ নিয়ে গতকাল ব্রি’র ক্যাম্পাস ছিল উত্তপ্ত। মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর গতকাল দুপুরে পুলিশি নিরাপত্তায় প্রথম দিন অফিস করেছেন নতুন মহাপরিচালক ড. আমিনুল ইসলাম। নতুন ডিজি নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্রিতে নজিরবিহীন উত্তেজনা ও বিভক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাই নয়, দেশের কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
জানা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্রির গ্রেডেশন তালিকার শীর্ষে থাকা মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আমিনুল ইসলামকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত দুই মাসের জন্য রুটিন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় তাকে এ দায়িত্ব দেয়া হয় বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। গতকাল সোমবার তিনি মন্ত্রণালয়ে যোগদান শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে যখন গাজীপুর ব্রি ক্যাম্পাসে যান, তখন উভয় গ্রুপের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল। আগে থেকেই সেখানে পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মহাপরিচালক পদে আরেক প্রার্থী ড. রফিকুল ইসলামকে সমর্থনকারী একটি অংশ রোববার রাতেই প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং পরদিন সকাল থেকে বিক্ষোভ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়। নতুন মহাপরিচালক ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাচ্ছিলেন। বিক্ষোভকারীদের নেতৃত্ব দেয়া কর্মকর্তা ড. হাবিবুর রহমান মুকুল নয়া দিগন্তকে বলেন, এই সময়ে ফ্যাসিবাদের দোসরকে ডিজি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, এটা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানতে পারছেন না। যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তিনি ব্রিতে যে কয়জন আওয়ামী লীগ করেন তাদের পাঁচজনের একজন। তা ছাড়া, তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মেরও অভিযোগ রয়েছে। ডিজির অর্ডার হওয়ার পরই ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হয়ে তালা লাগিয়ে দেন। সোমবার সারা দিন তারা বিক্ষোভ করেছেন। তিনি জানান, আমরা আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।
এ দিকে, এক পক্ষের বিক্ষোভের মধ্যেই ব্রি ক্যাম্পাসে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন ডিজিকে স্বাগত জানিয়ে শোডাউন করে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নতুন ডিজি পুলিশি নিরাপত্তা এবং তার অনুসারীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘেরাও হয়ে ডিজির চেয়ারে বসেন। ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনার মধ্যেই দুপুরে তিনি বিভাগীয় প্রধানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে মতবিনিময় করেন। দিনভর উত্তেজনার মধ্যেই তার প্রথম কর্মদিবস শেষ হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হলেও বিগত সরকারের সময়ের পদায়ন ও প্রভাববলয়ের রেশ এখনো কাটেনি। ফলে নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, শক্তি প্রদর্শন এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা প্রকট হয়ে উঠেছে, যা একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক।
এর আগে গত ২ এপ্রিল ব্রি’র মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। পরে ২৩ এপ্রিল পরিচালক (প্রশাসন) ড. মুন্নুজান খানম অবসরে গেলে শীর্ষ দুই গুরুত্বপূর্ণ পদ একসাথে শূন্য হয়ে প্রতিষ্ঠান কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় পড়ে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন এমন ফাইল দীর্ঘদিন নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, গবেষণা পরিকল্পনা ও ক্রয় কার্যক্রম ঝুলে যায়। মহাপরিচালকের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্ভব না হওয়ায় কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, এই নেতৃত্ব সঙ্কট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে গবেষণা কার্যক্রমে, যা ধানের মতো সময়নির্ভর ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা যানবাহন রিকুইজিশন বন্ধ থাকায় বিজ্ঞানীরা মাঠপর্যায়ে যেতে পারেননি, ফলে চলমান গবেষণা কার্যক্রম, পরীক্ষামূলক প্লট পর্যবেক্ষণ এবং নতুন প্রযুক্তি যাচাই ব্যাহত হয়েছে। একই সাথে দৈনন্দিন গবেষণা ব্যয়, মাটি পরীক্ষা, ল্যাবরেটরি উপকরণ সংগ্রহসহ অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গবেষণার গতি প্রায় থেমে যায়।
আর্থিক ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে পড়ে। প্রকল্পভিত্তিক অর্থ ছাড়ে মহাপরিচালকের অনুমোদন অপরিহার্য হওয়ায় বিভিন্ন প্রকল্পের কিস্তির অর্থ ছাড় বন্ধ থাকে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। একই সাথে বেতন-ভাতা প্রদানে বিলম্ব বা অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও কর্মস্পৃহা হ্রাস পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে বোরো মৌসুম চলমান থাকলেও কৃষকদের কাছে প্রযুক্তিগত সহায়তা পৌঁছাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহে বিঘœ ঘটায় সময়মতো সহায়তা না পেয়ে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আসন্ন আউশ মৌসুমে আবাদ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিচালক পদকে ঘিরে অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে তদবির করছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পদোন্নতি নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি এবং বিষয়গুলো এখনো তদন্তাধীন।
এ দিকে ব্রির ৭৫টি পদে সাম্প্রতিক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে লিখিত, মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং ভুয়া সনদের ঘটনাও সামনে এসেছে। এমনকি একটি ঘটনায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানোর কথাও জানা গেছে। এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং এলএসটিডি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডক্টর আনোয়ার হোসেন বলেন, বিগত প্রায় এক মাস মহাপরিচালক পদ শূন্য থাকায় প্রকল্পের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। আমরা আশাবাদী, তার যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে প্রকল্পের সব কার্যক্রম, ব্রির গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজ আবার গতিশীলতা ফিরে পাবে।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।



