মানুষ মারা গেলে জীবিতদের করণীয়

Printed Edition
মানুষ মারা গেলে জীবিতদের করণীয়
মানুষ মারা গেলে জীবিতদের করণীয়

সৈয়দ আল জাবের

মানুষের মৃত্যু অবধারিত। মানুষ মারা গেলে তার নিজের কিছুই করার থাকে না, করতে পারে না। কেউ মারা গেলে জীবিত মানুষদের ওপর কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য আছে। ইসলাম মৃত মানুষের জন্য সম্মানজনক সুন্দর করণীয় ব্যবস্থা দিয়েছে জীবিত মানুষদের ওপর। আমাদের সমাজে এমন অনেক কিছুই প্রচলিত আছে যা ইসলাম দেয়নি; কিন্তু মানুষ করছে। আমরা কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে মৃত মানুষের জন্য করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলোর বিবরণ তুলে ধরছি।

প্রথমত, আপনজনের ইন্তেকালের কষ্টে, বেদনায় কান্না আসবে অশ্রু ঝরবে; কিন্তু বিলাপ-মাতম করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, একজন মুসলিম যখন মারা যাবে তখন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়ে মাগফিরাতের দোয়ার পর প্রথম কাজ হলো তার চোখ ও মুখ খোলা থাকলে বন্ধ করে দেয়া। পুরো শরীর কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া।

তৃতীয়ত, বরই পাতা দিয়ে সহনীয় মাত্রায় পানি গরম করে সাবান দিয়ে আমরা যেভাবে অজু ও গোসল করি ঠিক সেভাবে অজু-গোসল করানো নাকে ও মুখের ভেতর পানি না দিয়ে। গোসল করানোর সময় সতর ঢেকে রাখতে হবে। গোসল শেষে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য তিনটি কাপড়ের কাফন পরিয়ে সুগন্ধি তথা কর্পূর-আতর মাখাবে। মহিলাদের চুলে তিনটি বেণী করে সামনের দিকে রাখবে। অনেককে দেখা যায়, চোখে সুরমা-কাজল দিয়ে সাজিয়ে দেয়। এসব করা যাবে না।

চতুর্থত, তারপর জানাজা নামাজ পড়ানো। জানাজার আগে সংক্ষিপ্তভাবে ইমাম অথবা মৃতের ওয়ারিশদের কেউ মৃতের ঋণ থাকলে পরিশোধ করার বিষয়ে কথা বলবেন। মুর্দা সামনে রেখে বিভিন্নজনের বক্তৃতা দিয়ে জানাজা সালাত বিলম্বিত করা উচিত নয়। এটি সুন্নাহ পরিপন্থী কাজ। পরবর্তীতে যেকোনো সময় স্মরণ অনুষ্ঠান করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে জানাজার আগে বা পরে মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো গুণাবলি বর্ণনা করবে তবে জানাজার আগে মাইয়েতকে সামনে রেখে ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করবেন, এই ব্যক্তি কেমন ছিল? আর সবাই সমস্বরে বলবে ভালো ছিল; সাক্ষ্য নেয়ার এ প্রথা ইসলাম অনুমোদিত নয়। আবার জানাজা সালাত শেষে আলাদা দোয়া করার রীতিও ইসলামসম্মত নয়, কেননা জানাজা সালাত নিজেই একটি দোয়া।

পঞ্চমত, জানাজা শেষে লাশের খাটিয়া-কফিন কাঁধে বহন করে কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় সুন্নাহ হলো গম্ভীর ও নীরব থাকা। এ সময় মুখে মনে কোনো জিকির-দোয়া নেই। প্রচলিত কফিন বা খাটিয়া বহনের সময় পঠিত জোরে জোরে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও অন্য কোনো জিকির পড়ার রীতি সুন্নাহবিরোধী কাজ। গুনে গুনে কদম ফেলা, খাটিয়ার চার পা কাঁধে নেয়ার জন্য বদল করাও ইসলামসম্মত কোনো রীতি নয়।

ষষ্ঠত, কবর উত্তর-দক্ষিণে লম্বা, গভীর, প্রশস্ত, সুন্দর হওয়া কাম্য। পায়ের দিক থেকে কবরে লাশ নামাবে। মাইয়েতকে কবরে রাখার সময় বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি/সুন্নাতি রাসূলিল্লাহি পড়বে। মুর্দাকে কেবলামুখী করে ডান কাতে শুইয়ে দেবে। বাঁশের বা কাঠের ফালি করা টুকরা দিয়ে মুর্দাকে ঢেকে মাটি দেবে। উপস্থিত সবাই বিসমিল্লাহ বলে তিন মুষ্টি মাটি দেবে। মাটি দেয়ার সময় ‘মিনহা খালাকনাকুম ওয়া ফিহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তা-রাতান উখরা’ পড়ার যে রীতি প্রচলিত আছে তা পড়া যাবে না। এটি পড়া সুন্নাহসম্মত নয়। কবরকে আধাবিঘত পরিমাণ উঁচু ও ঢালু করে পানি ছিটিয়ে দেয়া এবং ছোট ছোট পাথর ছড়িয়ে দেয়া মুস্তাহাব যাতে কবরের মাটি জমে যায় ও সুরক্ষিত থাকে। দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর মুনকার-নাকির ফেরেশতাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে মৃত ব্যক্তি যাতে ইস্তিকামাত তথা দৃঢ় থাকতে পারে, সে জন্য ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করা। সম্মিলিতভাবে দোয়া করা যাবে না। কবরের ওপর মাথা বা পায়ের কাছে খেজুরের ডাল বা অন্য কোনো গাছ বা গাছের ডাল পুঁতে দেয়া যাবে না। নবী সা: একটি কবরের ওপরে ডাল পুঁতে দিয়েছিলেন, সেটি একটি ব্যতিক্রম ও বিশেষ ঘটনা। তিনি অন্য কারো কবরে এমনটি আর করেননি। তাই আমরাও করব না। কবরস্থানের সীমানা প্রাচীর থাকতে পারে; কিন্তু একক কবরকে বাঁধাই করা যাবে না। কবরের ওপর নাম ও তারিখসহ কোনো কিছু লিখা জায়েজ নেই। কবরকে সাজানো, কবরে মোমবাতি জ্বালানো নিষিদ্ধ। কবর পাড়ানো, কবরের ওপর বসা নিষিদ্ধ।

সপ্তমত, মৃতের জন্য সাধারণ শোক তিন দিনের বেশি নয়। এ সময় সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি মৃতের পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো সুন্নাহ। আর বিধবা মহিলাদের জন্য শোক হলো চার মাস ১০ দিন গর্ভবতী হলে প্রসব পর্যন্ত এবং সাজসজ্জা পরিহার ও স্বামীর বাড়িতে ইদ্দত পালন করা।

অষ্টমত, মৃত্যুর সাথে মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়। আখিরাতে মানুষের বিচার হবে আকিদা ও আমল অনুসারে। জারি বা চলমান থাকে এমন কোনো আমল ও ইলমি কাজ করে গেলে এবং আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত প্রহরী ছিলেন এমন ব্যক্তি তার সওয়াব মৃত্যুর পরও পাবেন। এ ছাড়াও মৃত মানুষের জন্য জীবিত মানুষের কিছু আমল মাইয়েতের পক্ষ থেকে করলে তার সওয়াব তারা পাবেন। সে আমলগুলো হলো- মৃতের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা। বৈধ ওসিয়ত আদায় করা, মৃতের ঋণ শোধ করা, ফরজ হজ ও রোজা বাকি থাকলে তা আদায় করা। মৃত ব্যক্তির জন্য গোলাম আজাদ করা, নফল নামাজ পড়া ও নফল রোজা রাখা এবং ওমরাহ করা। মৃতের পক্ষ থেকে আলাদা কোরবানি ও কুরআন তিলাওয়াত করার বিধান ইসলামে নেই। মৃতের ওয়াদাপূর্ণ করা, মৃতদের বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সম্মানজনক সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

নবমত, সাদাকাহ করা। সাদাকাহ ব্যাপক বিষয়। ইসলাম প্রচার, প্রসারের জন্য দান করা, জনকল্যাণমূলক স্থায়ী কিছু করে দেয়া, গরিব-মিসকিনকে দান করা, মসজিদ, মাদরাসায় দান করা। দরিদ্র অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা, ঘরহীনকে বাড়ি বানিয়ে দেয়া, নিরন্ন-ক্ষুধার্তকে খাবার প্রদান ইত্যাদি খাতে সাদাকাহ করা।

দশমত, সম্মিলিত নয় এককভাবে কবর জিয়ারত করা। কবর জিয়ারতের সময় হাদিসে বর্ণিত দোয়া ছাড়া কুরআনের কোনো সূরা পাঠ, শুক্রবার ও ঈদের দিন বাধ্যতামূলক নিয়ম বানিয়ে কবর জিয়ারত, দরুদ পাঠ ইত্যাদি করা যাবে না।

একাদশত, জানাজা সালাত বাদে মৃতের জন্য আর কোনো বিধিসম্মত অনুষ্ঠান ইসলামে নাই। মৃত্যুর চতুর্থ দিনে অথবা চল্লিশতম দিনে কিংবা যেকোনো দিন মিলাদ পড়িয়ে জেয়াফত খাওয়ানো, মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে খাবার খাওয়ানো, যেকোনো সময় পারিতোষিকের বিনিময়ে কুরআনখানি, কুরআন খতমসহ বিভিন্ন খতম পড়ানোর যেসব রেওয়াজ-আনুষ্ঠানিকতা প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে, এর কোনো স্বীকৃতি কুরআন ও সুন্নাহতে নেই। রমজান মাসে করা কুরআন খতম মৃতের জন্য হুজুরকে দিয়ে বখশিয়া দেয়া সমাজে থাকলেও ইসলামে নেই।

পরিশেষে, মূলত সুযোগ মতো আবেগ অনুযায়ী যখন তখন ব্যক্তিগতভাবে মৃতের জন্য বেশি বেশি দোয়া ও সাদাকাহ করা হলো সুন্নাহ নির্দেশিত সহজ আমল। কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত দোয়ার পাশাপাশি নিজের ভাষায় আবেগমিশ্রিত দোয়াও করা যায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক