অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিক দরপতন অব্যাহত রয়েছে পুঁজিবাজারে। সপ্তাহের আগের দু’দিনের মতো গতকালও দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের অবনতি ঘটে। এ নিয়ে পুঁজিবাজারের পতন গড়াল টানা তৃতীয় দিনে। তবে অন্যান্য দিনের চেয়ে গতকালের বাজার আচরণ কিছুটা ভিন্ন ছিল। এ দিন অর্ধেকেরও বেশি সময় বাজারগুলো সূচকের উন্নতি ধরে রাখে। শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপ বাড়তে থাকলে দিনশেষে উভয় বাজারেই সব সূচকের পতন ঘটে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা ধারাবাহিক এ দরপতনে হতাশা ব্যক্ত করেন। তাদের মতে, এ মুহূর্তে পুঁজিবাাজরের সবচেয়ে বড় সমস্যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যে স্বস্তি থাকার কথা তা নেই। চার দিকে একটি গুমোটভাব বিরাজ করছে। এটিই বাজারকে প্রভাবিত করছে। সামনের দিনগুলোতে বাজার পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে তা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। আর তাদের এ মনোভাব থেকেই প্রতিনিয়ত আসছে বিক্রয়চাপ। পুঁজি হারানোর যে ভয় তা থেকে তৈরি হওয়া এ চাপ কিন্তু প্রকৃত অর্থে নিঃস্ব করে দিচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের সক্ষমতার কারণে কোনো একপর্যায়ে তাদের এ লোকসান সামলে উঠতে পারলেও বড় ক্ষতিটা ঘটে যাচ্ছে ক্ষুদ্র বিেিনয়াগকারীদের। তাই এ মুহূর্তে বিক্রয়চাপের পরিবর্তে ধৈর্য ধরাই তাদের জন্য উত্তম। কারণ অবস্থা যতই খারাপ হোক খুব সহসাই বাজার আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজি রক্ষা করতে গিয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলেও প্রকৃত অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। প্রতিনিয়তই তারা একটু একটু করে নিঃস্ব হতে চলেছেন। আবার এই সুযোগটা নিচ্ছেন সক্ষম ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ তারা জানে সাময়িকভাবে বাজারে দরপতন ঘটলেও একসময় এটি ঘুরে দাঁড়াবে। তাই এ মুহূর্তে তারা বাজারে অবস্থান নিচ্ছেন। অথচ একই সময় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই অধৈর্য হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে তাদের লোকসানের পাল্লা ভারী করছেন। তাই তাদের উচিত ভালো সময়ের অপেক্ষা করা। কারণ সামনে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তখন বাজার আবার ঘুরে দাঁতে পারে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৬ দশমিক ১৩ পয়েন্ট হাারয়। ৪ হাজর ৮৯০ দশমিক ০৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৫৩ দশমিক ৯০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৯৭ ও ৭ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট। এ নিয়ে গত তিন দিনে প্রধান সূচকটির ১০৮ দশমিক ৯০ পয়েন্ট হারায় ডিএসই। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৭৬ দশমিক ২৪ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৮৫ ও ৩৬ দশমিক ০৭ পয়েন্ট।
এ দিকে গতকাল দুই বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮২ শতাংশ দরপতনের শিকার ছিল। ডিএসইর বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল সব খাতেই দরপতন ঘটে। এ সময় বেশি দরপতনের শিকার ছিল সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কিছু কোম্পানির। সাধারণত দেখা যায়, স্বাভাবিক অবস্থায় মৌলভিত্তির দিক থেকে দুর্বল যে কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক দর বাড়ে, পতনের সময় এগুলোই বেশি দর হারায়। গতকালও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরপতন এ ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখে। আবার গ্রামীণফোনের মূল্যবৃদ্ধি বাজারের আরো বড় পতন ঠেকিয়ে দেয়। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৪৮টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৯৯টি। অপরিবর্তিত ছিল ৪৩টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৬০টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ৪১টির দাম বাড়লেও কমেছে ১০৩টির। এখানে অপরিবর্তিত ছিল ১৬টির দর।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে প্রকৌশল খাতের ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ২৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯৪ লাখ ৮১ হাাজার শেয়ার হাতবদল হয় এ দিন। ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় ৬২ লাখ ৮৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল সায়হাম কটন মিলস। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ফাইন ফুডস, লাভেলো আইসক্রিম, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ওরিয়ন ইনফিউশন ও বিডি থাই ফুডস।
লেনদেনের মতো ডিএসইতে গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানিও ছিল ডমিনেজ স্টিলস বিল্ডিং সিস্টেমস। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের সায়হাম টেক্সটাইলস। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড, সায়হাম কটন মিলস, রহিম টেক্সটাইলস, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এনআরবি থার্ড মিউচুয়াল ফান্ড, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও দেশবন্ধু পলিমার।
ডিএসইতে এ দিন দরপতনের শীর্ষে ছিল এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক। কোম্পানিটি ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ফ্যামিলিটেক্স। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, আরএসআরএম স্টিলস, বিডি থাই ফুডস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, ফরচুন স্যুজ, তুং হাই টেক্সটাইলস ও জুট স্পিনার্স।



