দ্বীপ জেলা ভোলার লালমোহন উপজেলায় দিন দিন কমে যাচ্ছে ফাল্গুনের আগমনী বার্তা বহনকারী শিমুল গাছ। একসময় গ্রামবাংলার মাঠ, খালপাড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ফুলে ভরা শিমুল গাছ এখন অনেকটাই বিরল। স্থানীয়রা জানায়, অযতœ, নির্বিচার কাটাকাটি এবং নতুন করে রোপণ না করার কারণেই গাছটি বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে।
শীতের শেষে পাতা ঝরিয়ে বসন্তের শুরুতেই দাউ দাউ করে লাল ফুলে ভরে ওঠে শিমুল গাছ। অন্য গাছের তুলনায় অনেক উঁচু হওয়ায় দূর থেকে নজর কাড়ে এ গাছ। ফুল ফোটার পর ফল ধরে, পরে সেই ফল শুকিয়ে ফেটে তুলা বের হয়। বাতাসে ভেসে বীজ ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে। প্রাকৃতিকভাবেই এ গাছের বিস্তার ঘটে। সাধারণত কেউ শখ করে শিমুল গাছ রোপণ করেন না, আবার তেমন যতœও নেয়া হয় না।
উদ্ভিদবিদদের তথ্যমতে, শিমুল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘বোববাক্স সাইবলিন’। এটি বোমবাকাসিয়াক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বীজ ও কাণ্ডের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার হয়। রোপণের ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে ফুল আসে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ ৮০-১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং অনুকূল পরিবেশে দেড় শ’ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগে গ্রামে গ্রামে প্রচুর শিমুল গাছ দেখা যেত। ধলীগৌরনগর ও রমাগঞ্জ এলাকার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, শিমুল শুধু সৌন্দর্যের গাছ নয়, এটি ঔষধি গাছ হিসেবেও পরিচিত। গ্রামাঞ্চলে বিষফোঁড়া, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ নানা রোগে এর মূল ও ছাল ব্যবহার করা হতো। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাতেও এখনো শিমুলের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও শিমুলের গুরুত্ব কম নয়। ফল থেকে পাওয়া তুলা বালিশ, লেপ ও তোষক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি বড় গাছ থেকে তুলা বিক্রি করে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব। আগের তুলনায় শিমুল তুলার দামও বেশি। তবু নতুন করে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণকাজ, ইটভাটার জ্বালানি, প্যাকিং বাক্স কিংবা টুথপিক তৈরির জন্য একসময় ব্যাপক হারে শিমুল গাছ কাটা হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রোপণ হয়নি। ফলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছও এখন কমে যাচ্ছে। মাঠঘাটে যে কয়েকটি গাছ দেখা যায়, সেগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে।
উপজেলার সচেতন মহলের দাবি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় শিমুল গাছ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বিদ্যালয়, সড়কের পাশ ও খাসজমিতে পরিকল্পিতভাবে শিমুল রোপণ করলে গাছটি টিকে থাকতে পারে। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় পড়ে জানবে, একসময় বাংলার মাটিতে বসন্ত এলেই লাল শিমুলে রঙিন হয়ে উঠত গ্রামবাংলা।



