- দেশে চাহিদার তুলনায় বেশি সার মজুদ রয়েছে : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা
- প্রধানমন্ত্রীর নামে ১৫৭টি অপতথ্য প্রচারিত হয়েছে
বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাসিজম চর্চাকারীদের বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি বলেন, যেসব গণমাধ্যম ইন্টেলেকচুয়াল বা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনায় ফ্যাসিজমকে সাপোর্ট করে, প্রমোট করে, কিংবা চর্চা করে তাদের সামাজিকভাবে ধিক্কার ও বয়কট করা ছাড়া আমরা কিছু করতে পারি না। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের (পিআইডি) সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তথ্যমন্ত্রী সরকারের ছয় মাসের বিশেষ অর্জন বিষয়ে তথ্য অধিদফতর প্রকাশিত ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান : গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ৬ মাস’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে স্থানীয় আলেম-ওলামাদের বাধা দেয়ার বিষয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের উত্তরে আন্দালিভ রহমান বলেন, কনসার্ট বাতিল হওয়া মানেই যে সরকার সহযোগিতা করেনি, তা নয়। হয়তো সেখানে নিরাপত্তার বিষয় ছিল, আরো অনেক কিছু ছিল। আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলে বিষয়টি জানতে পারব। তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক কনসার্ট হচ্ছে এবং বড় বড় আয়োজনও হচ্ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। আমাদের সরকারের তরফ থেকে এ ধরনের কোনো মানসিকতা নেই যে কোনো সাংস্কৃতিক বিষয়ে কোনো বাধা বা বিঘœ সৃষ্টি করা হবে।
একই প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যে অবস্থায় চলে গিয়েছিল, সেখান থেকে বর্তমান সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য এবং নাটকীয় অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, একটা ঘটনা ঘটছে না, তা নয়। একটা সময়ে যখন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায় এবং দেড়-দুই বছর ধরে কিছু গোষ্ঠী ওপরে উঠে যায়, তখন রাতারাতি সবকিছুর পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে যতটুকু উন্নতি হয়েছে, আমি এটাকে অনেক বড় ইমপ্রুভমেন্ট মনে করি।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করা কোনো ব্যবস্থার বিষয় নয়, এটি মানসিকতার বিষয়। নিজের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হয়। গত ১৭ বছরে সমালোচনা শোনার সেই মানসিকতা ছিল না। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে সরকারের পক্ষ থেকে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে কোনো নির্দিষ্টভাবে সংবাদ প্রকাশের নির্দেশনা দেয়া হয়নি। তিনি আরো বলেন, আপনারা গণতন্ত্রের আরেকটা স্তম্ভ। আমরা সবাই মিলেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকার কোনো নির্দেশনা দিতে পারে না উল্লেখ করে আন্দালিভ রহমান বলেন, আপনারা যখনই নিউজ করবেন, অবশ্যই আপনাদের নিউজ আপনারা করবেন। আমরা আপনাদের নিউজ ডিকটেট বা কমেন্ট করার পজিশনে নেই। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ১৭ বছর পর যে দায়িত্ব সরকার পেয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়ের একটি।
আন্দালিভ রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় পার করছে। শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই নয়, বৈশ্বিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। একইসাথে বর্তমান সরকারকে একই আমলাতন্ত্র নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ‘উই হ্যাভ দ্য সেম ব্যুরোক্রেসি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ দিনের যে প্রশাসনিক ধারা চলে এসেছে, সেটিও এক দিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সরকারের গণমাধ্যমবান্ধব মনোভাবের উদাহরণ দিতে গিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাথে সাম্প্রতিক আলোচনায় তার ও প্রতিমন্ত্রীর প্রথম অনুরোধ ছিল তাদের ছবি যেন যতটা সম্ভব কম দেখানো হয়। তবে দীর্ঘ দিনের প্রচলিত ব্যবস্থার কারণে এটিও পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভারতে অবস্থান করা পালাতক শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ শুধু একজনকে নয়, যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং যারা বিভিন্ন ঘটনায় অভিযুক্ত, তাদের সবাইকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে চায়। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনসহ এর আগের ঘটনাগুলোরও সঠিক বিচার হওয়া প্রয়োজন। ভারতের আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের সংবাদ বাংলাদেশের জন্য খুব একটা শুভকর নয় বলেই তার ধারণা।
এ ছাড়া সংবাদপত্রের ভুয়া প্রচারসংখ্যা বন্ধের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, কম পত্রিকা ছাপিয়ে লক্ষাধিক সার্কুলেশন দেখানোর অসত্য প্রক্রিয়া বন্ধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় জোরালোভাবে কাজ শুরু করেছে।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমে সরকারের ইতিবাচক কার্যক্রম তুলে ধরা হলে সরকার আরো ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা পাবে। তিনি বলেন, যে স্বাধীনতাটা এখন আছে, অতীতের চেয়ে সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা এখন আমরা গণমাধ্যমে দেখছি। আমরা কিন্তু এটার প্রতিফলন নিউজে কখনো দেখি না। কোথাও লেখা আছে যে গত ছয় মাসে গোয়েন্দা সংস্থার কোনো ব্যক্তি গণমাধ্যমে ফোন করেননি। আমরা কখনো দেখি নাই যে ছয় মাসে কোনো গুম এবং বিচারবহির্ভূত সরকারের মদদে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
গণমাধ্যমকে সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা যখন পজিটিভ নিউজ করবেন, আমরা কিন্তু এনকারেজড হবো, সরকার এনকারেজড হবে। আমরাও তো মানুষ। আমাদেরকে যখন পজিটিভ নিউজগুলো তুলে ধরবেন, তখন আমরা আরো ভালো কাজ, আরো ইমপ্রুভ করার অনুপ্রেরণা পাবো।
তবে সরকারের সমালোচনার অধিকার গণমাধ্যমের রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য গণমাধ্যম যা তুলে ধরতে চায়, তা প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার স্বাধীনতা সবার আছে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে।
সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে উল্লেখ করে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সরকার এবং রাষ্ট্রের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে, একটা লাইন আছে। এই জিনিসটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় বা রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো সংবাদ কিংবা কোনো কিছু প্রচার করা ঠিক নয়।
সরকারি টেলিভিশনে বিরোধী দলের খবর প্রচারের বিষয়েও নতুন নির্দেশনার কথা জানিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিটিভি, সংসদ টিভিসহ সরকারি টেলিভিশনগুলোতে শুধু সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের খবর প্রচার করা হবে না। আনুপাতিক হারে সংসদের বিরোধী দলের সদস্য এবং সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দলগুলোর খবরও প্রচার করতে হবে। তিনি বলেন, অন্তত তাদের কথা, যেগুলো বলছেন সরকারের বিরুদ্ধে হোক, পক্ষে হোক, জনগণের পক্ষে যে কথাগুলো, সেগুলো তুলে ধরতে হবে। এটাই হচ্ছে গণতন্ত্র।
সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিদ্ধান্তটি কার্যকর করতে মঙ্গলবার (গতকাল) থেকেই সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, সাংবাদিকদের কল্যাণে ট্রাস্ট ফান্ডের অনুদান দ্বিগুণ করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। অসুস্থ ও অসচ্ছল সাংবাদিকদের জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি টাকা হস্তান্তর করা হয়েছে।
দেশে সারের কোনো সঙ্কট নেই, বরং চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা: জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, ক্ষেত্র বিশেষ বিতরণ প্রক্রিয়ার কিছু সমস্যা আছে, এই সাময়িক সমস্যা দূর করতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিতরণ ব্যবস্থার অসংগতি ও কতিপয় স্থানে সাময়িক সঙ্কট নিয়ে তিনি বলেন, সরকার কৃষক ও জনগণের স্বার্থে বিতরণ ব্যবস্থায় সুনির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তন আনছে। কিছু ডিলার সময়মতো বরাদ্দকৃত সার না তোলায় যে সাময়িক অস্থিরতা দেখা গেছে, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, সরকারের বিরুদ্ধে ডিজিটালি ৪৬৪টি এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নামে ১৫৭টি অসত্য ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্যানেল আইনজীবী চূড়ান্ত করা হচ্ছে। দ্রুতই অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল নোটিশসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি, পিআইবির ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ প্রকল্পকে ‘নিউ মিডিয়া প্রজেক্ট’-এর আওতায় আরো বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১২-১৪ ডলার থেকে লাফিয়ে ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমানে এফএসআরইউ দুর্ঘটনার কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সহনীয় করতে দেশীয় উৎস থেকে ১৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলনে ১৫০টি কূপে খনন ও পুনঃখনন কাজ চলছে। ভোলা থেকে পাইপলাইনে দ্রুত গ্যাস আনার কাজ চলছে। এ ছাড়া শিল্পকারখানার বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন না নিয়ে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা এবং প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।



