গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) এক কনস্টেবল ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে সুদের কারবার, প্রতারণা, হামলা ও তদন্ত প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত কনস্টেবল শাহিন নূর আলমের প্রভাবের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন। দিনের পর দিন ঘুরেও মামলার সুরাহা না পেয়ে ওই ব্যবসায়ী এখন ন্যায়বিচার নিয়ে সন্দিহান।
আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, কনস্টেবল শাহিন নূর আলম জিএমপির সাবেক কমিশনারদের বডিগার্ড হিসেবে কর্মরত থাকাকালে এলাকায় একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি জিএমপি থেকে বদলি হয়ে ডিএমপির উত্তরা জোনের সিটি এসবি (সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ)-তে কর্মরত। জিএমপিতে থাকাকালীন সেই প্রভাব খাটিয়েই তিনি সুদের কারবার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে আসছিলেন। অনেক ব্যবসায়ী তার চক্রবৃদ্ধি ও আনলিমিটেড সুদের জাল থেকে রক্ষা পেতে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছেন।’
স্থানীয় সূত্র ও মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, শুধু গাজীপুর নয়, শাহিন ও তার ভাইদের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার হরিপুর গ্রামেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানেও তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী তাদের এলাকাছাড়া করেছিলেন বলে জানা গেছে।
ব্যবসায়ী মামুনের মামলায় অভিযোগ করা হয়, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে গাজীপুরের নলজানী এলাকায় ব্যবসায়ী মামুনের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তার আইফোন, নগদ টাকা ও গার্মেন্ট স্টকলটের মালামাল ছিনিয়ে নেয়া হয়। এ ছাড়া সুদাসলে জামানত হিসাবে মামুনের কাছ থেকে নেয়া পাঁচটি ব্ল্যাংক চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্প ফেরত চাইলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।
মামুন বলেন, ‘বাসন থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পায়। এমনকি আমার লুণ্ঠিত আইফোনও শাহিনের কাছ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু এরপরও মামলা রেকর্ড না করে রহস্যজনক নীরবতা পালন করা হয়। গোডাউন থেকে নিয়ে যাওয়া মালামাল শাহিনের কাছে পাওয়া গেলেও পুলিশ তা উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।’
থানায় প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-৩ এ সিআর মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই গাজীপুরকে নির্দেশ দেন। মামুনের অভিযোগ, অভিযুক্ত কনস্টেবল বিভিন্ন মহলে তদবির করে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরো জানান, এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে ডেকে নিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দিয়েছিলেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে এখনো শঙ্কিত মামুন। এ ছাড়া আলোচিত এই মামলার তদারকিতে থাকা পিবিআইর তৎকালীন পুলিশ সুপারের হঠাৎ বদলি নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, চার লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মামুনের কাছ থেকে পাঁচটি ব্ল্যাংক চেক ও একটি সাদা স্ট্যাম্প হাতিয়ে নেয়া হয়। সুদের টাকা পরিশোধ করা সত্ত্বেও চেকগুলো ফেরত না দিয়ে উল্টো ৪২ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, তাকে মানসিক চাপে ফেলতেই কনস্টেবল শাহিনের ভাইকে দিয়ে সুদূর নেত্রকোনা জেলায় মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।
অভিযুক্ত কনস্টেবল শাহিন নূর আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘মামুনের অভিযোগ মিথ্যা। পাওনা টাকার দায় থেকে বাঁচতে সে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা করেছে।’
এ বিষয়ে পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো: রকিবুল আক্তার বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। মামলাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনবোধে আমি নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী স্বচ্ছতার সাথে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
ন্যায় বিচার প্রত্যাশী ব্যবসায়ী মামুনের আক্ষেপ, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি কি আদৌ বিচার পাবো?’ প্রশ্নটি এখন কেবল তার নয়, বরং স্থানীয় সচেতন মহলেরও। তারা অনতিবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।



