বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে গত দেড় বছরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বাড়ে। প্রায় প্রতি মাসেই দেশে তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স এসেছে। ফলে দীর্ঘদিনের চাপ কাটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারো ৩০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। কিন্তু নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আবারো অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে। একই সময়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, যার ফলে আমদানির চাপও বাড়বে। এই দুই পরিস্থিতি একসাথে ঘটলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারো চাপে পড়তে পারে এবং ডলার সঙ্কট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটির মতো বাংলাদেশী কর্মরত আছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। গত ১৮ মাসে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রণোদনা, হুন্ডি দমনে কঠোরতা এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করে বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই প্রতি মাসে তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। এই ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য কিছুটা স্থিতিশীল করতে সাহায্য করেছে। ডলার বাজারেও কিছুটা স্থিতি ফিরেছিল। আমদানিকারকরা আগের তুলনায় সহজে ডলার সংগ্রহ করতে পারছিলেন এবং ব্যাংকগুলোতেও ডলারের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছিল। ফলে রিজার্ভ ফের ৩০ বিলিয়ন ডলার আতিক্রম করে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে সরাসরি সঙ্ঘাতে রূপ নেয়ার এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং অন্যান্য দেশ এতে জড়িয়ে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি অস্থির হয়ে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমে তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয় এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। অনেক সময় নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে কাজ কমে যায়। এসব খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত থাকায় তাদের কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব পড়ে। যদি বড় আকারে কাজ কমে যায় বা শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেয়া হয়, তাহলে তাদের আয় কমে যাবে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারো দ্রুত কমে যেতে পারে। কারণ দেশের আমদানি চাহিদা এখনো অনেক বেশি। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্যসহ নানা ধরনের পণ্য আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়। গত কয়েক বছরে ডলার সঙ্কটের কারণে অনেক আমদানি সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন বাড়াতে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আবারো গতি আসবে এবং ভোগ্যপণ্যের আমদানিও বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী মাসগুলোতে আমদানি ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানি বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। যদি একই সময়ে রেমিট্যান্স কমে যায়, তাহলে এই চাপ আরো তীব্র হয়ে উঠবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলার লেনদেনের জন্য নতুন বিনিময় হার কাঠামো চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় বা বিলাসী পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সাথে সাথে আমদানির চাহিদা বাড়বে, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ডলার সঙ্কটের সময় অতীতে দেখা গেছে, ব্যাংকগুলো অনেক সময় আমদানিকারকদের প্রয়োজনীয় ডলার দিতে পারে না। ফলে এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিলম্ব এবং অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় আগেভাগেই নীতিনির্ধারকদের সতর্ক হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রবাসী আয় আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি হুন্ডি বা অবৈধ পথে অর্থ পাঠানো বন্ধে কঠোর নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে। একই সাথে আমদানি ব্যবস্থাপনাতেও সতর্কতা দরকার। অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে উৎপাদনমুখী আমদানিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আমদানি চালু রাখতে হবে, কিন্তু বিলাসী পণ্য আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে না। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তখন আবারো ডলার সঙ্কট তীব্র হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যেতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি বর্তমানে কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সামনে বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, সম্ভাব্য রেমিট্যান্স হ্রাস এবং বাড়তি আমদানির চাপ- এই তিনটি বিষয় একসাথে প্রভাব ফেললে অর্থনীতি আবারো ডলার সঙ্কটে পড়তে পারে। তাই আগাম পরিকল্পনা ও সতর্ক নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি মোকাবেলা করা এখন সময়ের দাবি।


