ডিএসইতে ২০২৮ সালের মধ্যে ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর উদ্যোগ

প্রথম ধাপে ইনডেক্স ফিউচারস পরে সিঙ্গেল স্টক ফিউচারস ও অপশনস চালুর পরিকল্পনা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের পুঁজিবাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য ও বাজারের গভীরতা বাড়াতে এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে আর্থিক ডেরিভেটিভস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের উচ্চঝুঁকির আর্থিক পণ্য চালুর আগে বাজারের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, কেন্দ্রীয় কাউন্টার পার্টি (সিসিপি) ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

গতকাল (সোমবার) ডিএসইর উদ্যোগে ‘এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে আর্থিক ডেরিভেটিভস প্রবর্তন বিষয়ে অংশীজনদের সাথে সচেতনতা ও পরামর্শমূলক কর্মসূচি’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএসইসি, ডিএসই, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট বাজার অংশীজনরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিএসইসির কমিশনার মো: নাফিজ আল তারেক বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে ডেরিভেটিভ চালুর বিষয়ে কমিশন ইতিবাচক। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এ ধরনের পণ্য চালু করা হলে বাজারে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ডেরিভেটিভ চালুর আগে বাজারের সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে ডেরিভেটিভ চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে ইতোমধ্যে একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদ্যমান বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন, সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি (সিসিপি) ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নাফিজ আল তারেক বলেন, সিসিপি ব্যবস্থা কার্যকর না হলে ডেরিভেটিভ কার্যক্রম চালু করা কঠিন হবে। একই সাথে ব্রোকার, ট্রেডারসহ বাজারের অন্যান্য অংশীজনের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফিউচারস মার্কেট বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও হেজিংয়ের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে বাজারের তারল্য ও অস্থিরতার ঝুঁকি মোকাবেলায় ডেরিভেটিভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বাজার চালুর জন্য বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিসিবিএল এবং বাজারের অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

অনুষ্ঠানে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড প্ল্যাটফর্মে নতুন আর্থিক পণ্য চালুর উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিএসইসির সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, ডিএসই ও বিএসইসির সমন্বয়ে ডেরিভেটিভ চালুর জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারের অংশীজনদের মতামত নিয়ে ধাপে ধাপে এ উদ্যোগ এগিয়ে নেয়া হবে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো বিস্তারিত কর্মশালা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হবে।

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো: আবুল কালাম বলেন, ফাইন্যান্সিয়াল ডেরিভেটিভের মধ্যে ইনডেক্স ডেরিভেটিভ তুলনামূলকভাবে সহজে ক্যাশ সেটেলমেন্টের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত, ক্লিয়ারিং, সেটেলমেন্ট ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান এক্সচেঞ্জ ডেরিভেটিভস রুলস যুগোপযোগী করে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হবে। একই সাথে ডেরিভেটিভ ট্রেডিংয়ের উপযোগী প্ল্যাটফর্ম, সিসিপি, রিয়েল-টাইম মার্জিনিং, পজিশন মনিটরিং এবং মার্ক-টু-মার্কেট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।

বিএসইসির এই কর্মকর্তা বলেন, নির্ধারিত অ্যাকশন প্ল্যান ও সময়সীমা অনুযায়ী প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। পুঁজিবাজারের গভীরতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার সাইয়িদ মাহমুদ জুবায়ের বলেন, আধুনিক আর্থিক পণ্য প্রবর্তনের মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডিএসই ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে ডেরিভেটিভ পণ্য চালুর পরিকল্পনা করেছে এবং এ বিষয়ে বিএসইসির অনুমোদন রয়েছে।

তিনি জানান, ডেরিভেটিভ চালুর জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং বাজারের অংশীজনদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ডিএসই একটি কৌশল ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে বিএসইসির কাছে জমা দিয়েছে। কমিশনের সহযোগিতায় প্রস্তুতি কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

এ সময় উপস্থিত বক্তারা বলেন, প্রথম পর্যায়ে নিজস্ব সূচকভিত্তিক স্টক ইনডেক্স ফিউচারস চালু করা হবে। পরবর্তী পর্যায়ে সিঙ্গেল স্টক ডেলিভারেবল ফিউচারস এবং দীর্ঘমেয়াদে অপশনস মার্কেট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তারা মনে করছেন, ডেরিভেটিভ চালু হলে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পোর্টফোলিওর ঝুঁকি কমাতে হেজিংয়ের সুযোগ পাবেন।

তবে ডেরিভেটিভ পণ্য সাধারণ শেয়ার ও বন্ডের তুলনায় জটিল এবং এতে লিভারেজের কারণে ঝুঁকিও বেশি। ফলে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা, বাজার অংশীজনের দক্ষতা, শক্তিশালী নজরদারি এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা ছাড়া এ বাজার চালু হলে উল্টো বাজারের অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।