- দুধ সংগ্রহ অর্ধেকে নেমেছে; ডুবতে বসেছে খামারিদের স্বপ্নের সমবায় প্রতিষ্ঠান
- চিনি ক্রয়ের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দামে কার্যাদেশ
দেশে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটা এখন গভীর আস্থাসঙ্কটে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন খামারিদের সংগঠিত শক্তিতে গড়ে ওঠা ‘মিল্কভিটা’ এখন একের পর এক অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি ও ব্যবস্থাপনাগত অস্বচ্ছতার অভিযোগে অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। সর্বশেষ ৩৫০ টন সাদা চিনি ক্রয়ের টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে প্রায় ৮৩ লাখ টাকা বেশি দামে কার্যাদেশ দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতির ক্ষতকে নতুন করে সামনে এনেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উৎকোচ দাবি, খামারিদের শেয়ার হিসাবের অস্বচ্ছতা এবং দুধ সংগ্রহে ধারাবাহিক পতনের মতো গুরুতর প্রশ্ন। সব মিলিয়ে খামারিদের আস্থার এই প্রতীক এখন খাদের কিনারায়।
টেন্ডারে ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ ও উৎকোচ দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২২ ডিসেম্বর মিল্ক ইউনিয়ন ৩৫০ টন সাদা চিনি ক্রয়সহ ১৩টি বিষয়ের ওপর টেন্ডার আহ্বান করে। চিনির টেন্ডারে ‘পূর্ণতা এন্টারপ্রাইজ’ ট্যাক্স-ভ্যাটসহ প্রতি কেজি ৯৯.৯৭ টাকা দরে মোট ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার দরপত্র জমা দেয়। মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, লোয়েস্ট বিডারকে বাদ দিয়ে ৪ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকার দরদাতা ‘ফার্স্ট এন্টারপ্রাইজ’কে কার্যাদেশ দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রতি কেজি ১২২ টাকা দরে চিনি সরবরাহে আগ্রহী এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিলে মিল্কভিটার অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৮৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকত না।
পূর্ণতা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলাউদ্দিন শেখ অভিযোগ করেন, কোয়ালিটি টেস্টে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও তাকে কার্যাদেশ দেয়া হচ্ছে না। তার দাবি- মিল্ক ভিটার পরিচালক জেড ওয়াই খান মজলিশ তার কাছে ৩০ লাখ টাকা উৎকোচ দাবি করেছেন। রাজি না হওয়ায় কাগজপত্রে ঘাটতির অজুহাত তোলা হয়েছে, যদিও কোনো কাগজে ঘাটতি রয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। এই টেন্ডারটি প্রায় এক বছর ধরে চলমান এবং এর আগে তিনবার রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত পরিচালক জেড ওয়াই খান মজলিশ জানিয়েছেন যে তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। অন্য দিকে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার জাহিরুল আলিমকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অন্তর্বর্তী কমিটির কর্মকাণ্ড ও আইনি প্রশ্ন
জাহিরুল আলিমের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি বর্তমানে মিল্ক ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত এই কমিটির মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। সমবায় আইন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী কমিটি স্থায়ী সম্পদ হস্তান্তর বা বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে পারে না। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তেজগাঁওয়ের প্রধান কার্যালয়ের প্রায় দুই একর জমি এবং মিরপুরের ৩.৩৬ একর জমিতে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণে পছন্দমতো ডেভেলপার নিয়োগ দিয়ে অর্থ লোপাটের অপচেষ্টা করছে বর্তমান কমিটি। সমবায় অধিদফতরের আদেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার নির্দেশ থাকলেও তা কার্যকর না করে আইনি জটিলতার আড়ালে নির্বাচন দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা হচ্ছে। গত ৬ নভেম্বর নতুন করে এক বছরের জন্য ৯ সদস্যের কমিটি অনুমোদন পায়, কিন্তু এই কমিটির সময়েও মিল্ক ভিটায় দুর্নীতির ডালপালা আরো বিস্তৃত হয়েছে বলে সমবায়ীদের দাবি।
আওয়ামী প্রভাব ও রাজনৈতিক সমীকরণ
গত ৬ নভেম্বর গঠিত নতুন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ নেতা নাজিম উদ্দীন হায়দারের স্ত্রী রুবি আক্তার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান পদ দখল করে ব্যাপক লুটপাট চালিয়েছিলেন শেখ হাসিনার চাচা শেখ নাদির হোসেন লিপু। তার দুর্নীতির বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দীন হায়দার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাসিনা সরকারের পতনের পর মিল্কভিটায় সংঘটিত দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ জরুরি ছিল। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান জাহিরুল আলিম তা চেপে গিয়ে উল্টো নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির সম্ভাব্য নতুন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আস্থা অর্জনে দৌঁড়ঝাপ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শেয়ার হিসাবের অস্বচ্ছতা ও খামারিদের ক্ষোভ
সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি হলেন খামারিরা। অথচ তাদের শেয়ার হিসাব নিয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বড় ধরনের অস্বচ্ছতা চলছে। প্রতি লিটার দুধের মূল্য থেকে ৪০ পয়সা শেয়ার হিসেবে কর্তন করা হলেও ২০০৬ সালের পর থেকে খামারিদের কোনো শেয়ার সার্টিফিকেট বা হালনাগাদ হিসাব দেয়া হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর সাধারণ সভায় শেয়ার সনদ বিতরণের কথা থাকলেও তা ফাইলবন্দী হয়ে আছে। খামারিদের ভাষ্য, তাদের ঘাম ঝরানো অর্থ কোথায় জমা হচ্ছে বা কত শেয়ার জমেছে, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। এটি সমবায় কাঠামোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করে দিচ্ছে।
দুধ সংগ্রহে ধস ও খামারিদের দুর্দশা
বর্তমানে মিল্কভিটা প্রতি লিটার দুধ কিনছে মাত্র ৫০ টাকায়, যা বাজারে ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ। উৎপাদন ব্যয়, গোখাদ্যের উচ্চমূল্য ও চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা এই দামে টিকে থাকতে পারছেন না। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের চিত্র এখন অত্যন্ত করুণ। একসময় যেখানে শত শত গাভী ছিল, সেখানে এখন অনেক খামারে পাঁচ-ছয়টি গরু অবশিষ্ট আছে। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মিল্কভিটা ৭ কোটি ৩৬ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করেছিল, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ কোটি ৪২ লাখ লিটারে। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে সমবায়ভিত্তিক দুধ সংগ্রহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর বিপরীতে প্রাণ, আড়ং বা আকিজের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলো বাজার দখল করে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিল্কভিটাকে রক্ষা করতে হলে টেন্ডার অনিয়ম, উৎকোচ দাবি ও আর্থিক অস্বচ্ছতার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-টেন্ডারিং বাধ্যতামূলক করা এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে খামারিদের মুক্তি দিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে মিল্কভিটা যাত্রা শুরু করেছিল, তা আজ দুর্নীতির ভারে ন্যুব্জ। খামারিদের ঘাম আর শ্রমে গড়া এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে এখন প্রয়োজন কঠোর সংস্কার ও জবাবদিহিতা। তা না হলে মাঠের সেই দরিদ্র খামারিকেই বড় ক্ষতির বোঝা বইতে হবে, যার কল্যাণের কথা বলে এই সমবায় গড়ে তোলা হয়েছিল।



