ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি থমকে আছে সুদহার ও জামানতে

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই এসএমই খাতের। একই সাথে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এসএমই খাত। তবু বাস্তব চিত্র বলছে, ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, কঠোর জামানত শর্ত এবং জটিলপ্রক্রিয়া তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই এসএমই এবং মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এই খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি। তবে বাস্তবতা বলছে এ খাতের প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণ পেতে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসএমই খাতে প্রায় তিন লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। তবে এই বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশই গেছে মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের কাছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অংশ মোট এসএমই ঋণের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্য দিকে দেশে নিবন্ধিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি হলেও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ সুবিধা পাচ্ছেন এক-তৃতীয়াংশেরও কম।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদের হার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নীতিগতভাবে সুদের হার ৯ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর সুদের হার আরো বেশি হয়ে যায়। প্রসেসিং ফি (১-২ শতাংশ), সার্ভিস চার্জ, বীমা ব্যয় ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সুদের হার দাঁড়ায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশে। কিছু নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এ হার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কিস্তিভিত্তিক পরিশোধব্যবস্থায় মাসিক নগদ প্রবাহে বড় চাপ তৈরি করে, বিশেষ করে যেসব ব্যবসায় লাভের মার্জিন ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

রাজধানীর মিরপুরে একটি ছোট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানের মালিক সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিলে বছরে সুদ ও অন্যান্য চার্জ মিলিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়াতে হয় অথবা লাভ কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি জানান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামানত ইস্যুতে পরিস্থিতি আরো জটিল। ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত ঋণের ১২০ থেকে ১৫০ শতাংশ সমমূল্যের স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অংশ ভাড়াকৃত দোকান বা কারখানায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের নিজস্ব জমি বা সম্পত্তি না থাকায় জামানত দেয়া সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, শিল্পনগরীগুলোর বাইরে পরিচালিত ক্ষুদ্র শিল্পের প্রায় ৬০ শতাংশই ভাড়াভিত্তিক স্থাপনায় চলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রচলিত জামানত কাঠামো তাদের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায় ডিফল্ট ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এসএমই খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ, যা বড় শিল্পঋণের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, ঝুঁকি বিবেচনা করেই সুদের হার নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু অতিরিক্ত জামানত চাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।

এদিকে নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এসএমই ঋণের মধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের অংশ প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করেছে এবং সুদের হার তুলনামূলক কম নির্ধারণ করেছে, তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন সীমিত। সম্পত্তির মালিকানা কম থাকায় জামানত জোগাড় করতে না পারাই এর প্রধান কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসএমই খাতের ভেতরে শ্রেণীভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি। মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও আর্থিক কাঠামো তুলনামূলক শক্তিশালী হওয়ায় তারা সহজে ঋণ পায়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা যাদের মূলধন ৫০ লাখ টাকার নিচে তারা প্রান্তিক অবস্থায় রয়ে যায়। অনেকেই অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন, যেখানে সুদের হার বার্ষিক হিসাবে ২৪ থেকে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মো: ওবায়দুর রহমান বলেন, ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম সম্প্রসারণ করা গেলে জামানত সমস্যার সমাধান আংশিকভাবে সম্ভব। বর্তমানে সীমিত পরিসরে গ্যারান্টি সুবিধা থাকলেও তা দেশের মোট ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার তুলনায় অপ্রতুল। উন্নয়নশীল অনেক দেশে সরকার বা বিশেষায়িত সংস্থা ঋণের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যারান্টি দেয়, ফলে ব্যাংকের ঝুঁকি কমে এবং উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়ন পান।

তিনি বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার ঘটলেও বড় অঙ্কের ব্যবসায়িক ঋণের ক্ষেত্রে তা এখনো কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠেনি। মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয়, যা উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য যথেষ্ট নয়।

তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তা, বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন বা ঋণ পাওয়া একটি বড় বাধা। ডকুমেন্টেশন সমস্যা, দক্ষতার ঘাটতি ও ‘ব্যাংকারদের অনীহার’ কারণে তারা প্রায়ই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।

২০০৭ সালে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু করা ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তহবিলও সীমিত। ব্যাংকগুলোর সাথে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ঋণের সুদে কিছু ভর্তুকি দেয়া হলেও, ‘প্রকৃত প্রান্তিকরা খুব কমই এই সুবিধা পান’ বলে তিনি জানান।

সিরাজগঞ্জের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আব্দুর রহমান বলেন, তারা অনুদান বা ভর্তুকি চান না; চান ন্যায্য ও সহজ শর্তে ঋণ। সুদের হার ও জামানতের কঠোর শর্ত শিথিল করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে এসএমই খাতের প্রকৃত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই খাত দেশের বড় একটি অংশের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করে। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারের নানা উদ্যোগ ও প্রণোদনার পরও এসএমই উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে সহজে ঋণ পাচ্ছেন না। নীতি আর বাস্তবতার এই ব্যবধান তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, এখনো ব্যাংকে গেলে নারী উদ্যোক্তাদের অন্য চোখে দেখা হয়। লাইসেন্স বা টিন নিতে গেলেও হেলাফেলা করা হয়। এ ধরনের আচরণ বদলাতে হবে। জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা পর্যায়ে সব জায়গায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য হেল্পডেস্ক থাকা উচিত। তিনি বলেন, অনেক নারী এখনো প্রকাশ্যে কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন। পরিবার ও সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনও জরুরি।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এসএমই খাতকে কার্যকরভাবে সহায়তা দেয়া এখন সময়ের দাবি। সুদের হার ও জামানতের বাধা দূর না হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়বে, আর তাতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত গতি আসবে না বলে তারা মনে করেন।