নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের সেনা, বিমান ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় কৌশলগত বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ‘পূর্ব সীমান্তে সক্রিয় প্রস্তুতির ইঙ্গিত’ হিসেবে দেখছেন। টিআরটি ওয়ার্লড ও দি উইক এর প্রতিবেদনে বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে।
৩ নতুন সেনাঘাঁটি ও সীমান্ত টহল বৃদ্ধি: সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে তিনটি নতুন সম্পূর্ণ কার্যকর সেনা গ্যারিসন স্থাপন করেছে- আসামের ধুবড়ির বামুনি, বিহারের কিষেনগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায়।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আরসি তিওয়ারি সম্প্রতি চোপড়া ঘাঁটি পরিদর্শন করে সৈন্যদের প্রশংসা করেন এবং ‘ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সতর্ক থাকার’ আহ্বান জানান।
চোপড়ার ঘাঁটি বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া সীমান্ত থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির বিপরীতে। অন্যদিকে বামুনিগাঁও ঘাঁটির ফলে ধুবড়ি অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ভারতের নজরদারি সক্ষমতা আরো প্রসারিত হয়েছে, যে অঞ্চলকে আগে ‘নজরদারির অন্ধ স্থান’ হিসেবে ধরা হতো।
আকাশে শক্তি প্রদর্শন : সম্প্রতি ভারতের আসামের গুয়াহাটিতে দেশটির বিমানবাহিনীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিমান প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাফায়েল, সুখোই ও মিরাজ যুদ্ধবিমান ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর দিয়ে উড়ে সামরিক মহড়া প্রদর্শন করে।
যদিও সরকারিভাবে এটি বিমানবাহিনীর বার্ষিকী উদযাপন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, অনেক বিশ্লেষক একে পূর্ব সীমান্তে ‘সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের বার্তা’ বলে মনে করছেন।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর উত্তেজনা : বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লব’-এর পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। হাসিনার পতনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেয়ায় নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়।
ভারতীয় রাজনৈতিক মহল বাংলাদেশের আন্দোলনকে শুরুতে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে দেখলেও, ঢাকার নতুন প্রশাসন চীন ও পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর ফলে ভারতীয় নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ আরো গভীর হয়েছে।
শিলিগুড়ি করিডোর : ভারতের ‘দুর্বলতম বিন্দু’: ভারতের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য উইক-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন গ্যারিসনগুলো মূলত শিলিগুড়ি করিডোর রক্ষার উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছে। এই সরু ভূখণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে সংযুক্ত করে, যা দেশটির অন্যতম কৌশলগত দুর্বল স্থান হিসেবে পরিচিত।
একজন জ্যেষ্ঠ ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ম্যাগাজিনটিকে বলেন, ‘এই স্থাপনাগুলোর উদ্দেশ্য হলো দুর্বলতা দূর করা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানো।’
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কৌশলগত বার্তা : সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সময়টিই এসেছে এমন এক সময়ে, যখন পাকিস্তানের নৌবাহিনী প্রধানের বিরল ঢাকা সফর এবং চীনের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা আলোচনার খবর প্রকাশ পেয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ কেবল সীমান্ত সুরক্ষার অংশ নয়, বরং চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ঘনিষ্ঠতা মোকাবেলার প্রতিরোধমূলক অবস্থান।
ড. ইউনূসের এক বক্তব্য- যেখানে তিনি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে ‘স্থলবেষ্টিত’ ও বাংলাদেশকে ‘সমুদ্রের অভিভাবক’ হিসেবে বর্ণনা করেন ভারতীয় কৌশলবিদদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে : ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, ঢাকা, বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির মধ্যে ‘অবিশ্বাসের নতুন স্তর’ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সীমান্ত ঘাঁটি স্থাপন ‘শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং একটি পূর্ব-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’-যা সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক চাপ মোকাবেলার জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করবে।



