ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

কেন বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া দিচ্ছে

উত্তর রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের তেমন কোনো অর্থবহ উপস্থিতি নেই। এর পরিবর্তে সেখানে রয়েছে আরাকান আর্মি, একটি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন যা এখন রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ রাখে । এই রূপান্তর বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ওলটপালট করে দিয়েছে এবং একসময় এটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা উন্মোচিত করেছে।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition

বিদ্রোহী বাহিনী আরাকান আর্মি এখন সীমান্তের মিয়ানমার অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এটি বাংলাদেশকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য একতরফা পদ্ধতির ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে বাধ্য করছে।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ মিয়ানমারের সাথে দেশের ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের কিছু অংশে বেড়া দেয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। ঢাকা কেন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে তা বুঝতে হলে, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বরের দিকে ফিরে তাকাতে হবে, যেদিন আরাকান আর্মি মংডু দখল করে এবং বাংলাদেশের সাথে উত্তর রাখাইন রাজ্যের সীমান্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের কাছে, মংডুর পতন মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে একটি মাইলফলক ছিল যা সামরিক জান্তার সঙ্কুচিত ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণের আরেকটি ইঙ্গিত।

তবে ঢাকার জন্য, এর অর্থ ছিল তার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের বেশির ভাগ অংশজুড়ে কার্যকর মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিলুপ্তি। আজ, বাংলাদেশ সেই সীমান্তের বিশাল অংশজুড়ে আর কোনো কার্যকর রাষ্ট্রের মুখোমুখি নয়।

উত্তর রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের তেমন কোনো অর্থবহ উপস্থিতি নেই। এর পরিবর্তে সেখানে রয়েছে আরাকান আর্মি, একটি জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন যা এখন রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ রাখে । এই রূপান্তর বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ওলটপালট করে দিয়েছে এবং একসময় এটি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা উন্মোচিত করেছে।

ঢাকার সামনে মূল সমস্যাটি হলো একটি গভীর কাঠামোগত অসামঞ্জস্য। মিয়ানমার সরকার, তার ঐতিহাসিক ত্রুটি এবং পদ্ধতিগত ব্যর্থতা সত্ত্বেও, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, কূটনৈতিক প্রোটোকল এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে আবদ্ধ ছিল। আরাকান আর্মি তা নয়।

আরাকান আর্মি ক্রমবর্ধমানভাবে একটি শাসক কর্তৃপক্ষের মতো আচরণ করছে, বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার পরিচিত মাধ্যমগুলো মূলত অবিশ্বস্ত হয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ অসম্ভব নয়; আটককৃত বেসামরিক নাগরিকদের মুক্তি নিশ্চিত করতে এবং জরুরি সীমান্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সম্পৃক্ত হয়েছে।

কিন্তু এই আলাপ-আলোচনাগুলো সেইসব পূর্বাভাসযোগ্যতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং পারস্পরিক বাধ্যবাধকতা ছাড়াই ঘটে, যা সাধারণত স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কে থাকে।

এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার পরিণতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। গত দেড় বছরে নাফ নদী ও এর সংলগ্ন জলসীমা থেকে আরাকান আর্মি শত শত বাংলাদেশী জেলে এবং রোহিঙ্গা বাসিন্দাকে আটক করেছে। এই ঘটনাগুলো একদিকে যেমন পূর্বে অস্পষ্ট থাকা জলপথের ওপর আরাকান আর্মির একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে প্রতিফলিত করে, তেমনই অন্য দিকে আনুষ্ঠানিক প্রোটোকলের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিকেও তুলে ধরে, যার মাধ্যমে সাধারণত এই ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করা হতো।

একই সাথে, বান্দরবানে বাংলাদেশী বাসিন্দারা কৃষি জমির কাছে ল্যান্ডমাইন এবং অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্রের সম্মুখীন হচ্ছেন যা সীমান্তের ওপারেই চলমান লড়াইয়ের মারাত্মক ধ্বংসাবশেষ। সীমান্তটি মেথামফেটামিন এবং অন্যান্য অবৈধ মাদকের একটি প্রধান ট্রানজিট রুটেও পরিণত হয়েছে, এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো রেকর্ড পরিমাণ মাদক জব্দের খবর দিয়েছে। প্রস্তাবিত বেড়াটিকে এই প্রেক্ষাপটে বোঝা উচিত। এটি এমন একটি সীমান্তের ওপর কিছুটা একতরফা নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের একটি প্রচেষ্টা, যেখানে প্রচলিত সমন্বয় ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। স্বীকার করতেই হবে, এই পদ্ধতির যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি বেড়া মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক প্রণোদনা দূর করতে পারে না, নাফ নদীর জটিল সামুদ্রিক এখতিয়ারগত বিরোধের সমাধান করতে পারে না, বা রাখাইন রাজ্যে অস্থিতিশীলতার পেছনের অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারে না। কিন্তু বেড়াটি এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে কি না, শুধু সেই ভিত্তিতে এর মূল্যায়ন করলে এর উদ্দেশ্যের একটি অংশই বাদ পড়ে যায়।

আরো সুস্পষ্টভাবে বললে, এই বেড়া বাংলাদেশের নিজস্ব সীমানার বাইরেও একটি বার্তা পাঠায়। এটি অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তা দেয় যে, ঢাকা তার সীমানার সম্পূর্ণ বাইরে সৃষ্ট একটি সঙ্কটের ব্যয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বহন করতে চায় না এবং মিয়ানমারের কাঠামোগত পতনের পরিণতির দায় কেবল বাংলাদেশের একার ওপর বর্তাতে পারে না।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে, যাদের অনেকেই প্রায় এক দশক ধরে এই দেশে অবস্থান করছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সবসময়ই ছিল তাদের প্রত্যাবাসন এবং ঢাকা সেই লক্ষ্যে মিয়ানমার রাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অবশেষে যে ভূখণ্ডে ফিরে যাবে, তার বেশির ভাগই এখন এএ-এর নিয়ন্ত্রণে যে সংগঠনটি নিজেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত। রোহিঙ্গাদের প্রতি আরাকান আর্মির বৈরিতা সুপ্রতিষ্ঠিত।

ভবিষ্যতে আরাকান আর্মির পরিচালিত যেকোনো ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। পরিকল্পিত সীমান্ত বেড়াটি হয়তো ভবিষ্যতের শরণার্থীদের আটকাতে পারবে না, কিন্তু এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম অবস্থানের প্রতীক : যে শরণার্থী সঙ্কটটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতারই ফল, যার সমাধান মিয়ানমারের ভেতর থেকেই প্রয়োজন।

এই চাপগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ একা নয়। থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন সকল দেশেরই মিয়ানমারের ভূখণ্ডের সাথে সীমান্ত রয়েছে, যেখানে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলো এখন বিভিন্ন মাত্রার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনন্য। দশ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেয়ার পাশাপাশি এমন একটি সীমান্ত পরিচালনা করা, যেখানে কার্যকর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়েছে, তা এক দ্বৈত মানবিক ও নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করে, যা এর আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা তুলনীয় রূপে মোকাবেলা করে না।

পরিশেষে, সীমান্তে বেড়া দেয়ার দিকে বাংলাদেশের এই পদক্ষেপটি সীমান্তজুড়ে ঘটে চলা ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তরের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি একটি ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার এমন একটি সঙ্ঘাতের বিস্তারজনিত প্রভাব নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রচেষ্টার একটি অংশ, যা বাংলাদেশ সৃষ্টিও করেনি এবং সহজে নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া, কোনো প্রতিবন্ধকতাই সেই দ্বিপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হতে পারে না, যেগুলো একসময় এই সীমান্ত পরিচালনা করত। কিন্তু সেগুলোর কার্যকর অনুপস্থিতিতে, চেষ্টা করা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো উপায় নেই।