নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আজ স্বাধীনতার ৫৬ বছরে পদার্পণ করেছে।
প্রতি বছরের মতো এবারো নানা আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য আত্মত্যাগ আমাদেরকে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার পথে দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে চলার সাহস জোগায় উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত সমাজ ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সর্বস্তরের জনগণের ক্ষমতায়নকে সুসংহত করা। রাষ্ট্র ও সমাজের সব ক্ষেত্রে সাম্য, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে স্বাধীনতার অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুখী-সমৃদ্ধ মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা আমাদের পবিত্র কর্তব্য।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অপশাসন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও অনাকাক্সিক্ষত জ্বালানি পরিস্থিতির বিরূপ প্রভাব দেশ ও দশের ওপর পড়ছে। সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে একটি স্বনির্ভর, গতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলেছে। এসময় দৃঢ় জাতীয় ঐক্য, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেম খুব জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির অগ্রগতি ও উন্নয়নের ধারাকে আরো বেগবান করতে জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং দেশপ্রেমের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, আসুন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া খান। রাত ১১টায় তিনি করাচি পৌঁছার খবর ঢাকায় পাঠানোর পরপরই শুরু হয় গণহত্যা অভিযান। রাজপথে নেমে আসে ট্যাংক এবং সশস্ত্র সৈন্য। পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য শুরু হয় ইতিহাসের নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ২৫ মার্চে গণহত্যা পরিচালনার সময় পুলিশ, তৎকালীন ইপিআর এবং বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈনিক ও অফিসাররা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। পরের দিন থেকে শুরু হয় স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। যে যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে চূড়ান্ত সেই যুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াই-সংগ্রাম আর ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ পায় লাল-সবুজের পতাকা খচিত একটি স্বাধীন ভূখণ্ড।
কর্মসূচি : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ দিন ঢাকাসহ সারা দেশে প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা, বিদেশী কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এ ছাড়া জেলা ও উপজেলার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হবে।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন এবং ঢাকা শহরে সহজে দৃশ্যমান ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা ও অন্যান্য পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছে। দেশজুড়ে সরকারি ছুটি আজ। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্র বিশেষ ক্রোড়পত্র, নিবন্ধ ও সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়া মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করছে।
এদিকে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপনের জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে নি-িদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
এদিকে যে লক্ষ্য নিয়ে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ হয়েছিল, সেই লক্ষ্য আজও অর্জন হয়নি। মানুষের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে। দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হয়ে গেছে। ধনীরা আরো ধনী হয়েছে। এক শ্রেণীর হাতে চলে গেছে সব সম্পদ। স্বাধীনতা বা মুক্তির লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পারিনি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গিয়েছিল বুর্জোয়াদের হাতে। বুর্জোয়ারা যে উন্নতি চায়, সেই উন্নতি হচ্ছে পুঁজিবাদী উন্নতি। বাংলাদেশে পুঁজিবাদী উন্নতি হয়েছে ঠিকই, যা বৈষম্য সৃষ্টি করে, বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে, দেশপ্রেমের ঘাটতি তৈরি করে। ফলে সম্পদ পাচার হয়ে গেছে। বড় লোকেরা দেশের সব সম্পদ পাচার করে বিদেশে নিয়ে গেছে। মানুষ বিশ্বাস করে বা আস্থার ফলে ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখে, সেখানে ব্যাংকাররা রক্ষক হয়ে নিজেরাই ভক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে। নিজেরাই টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। কাজেই নিঃস্বকরণ ঘটেছে। এই দেশটাকে যারা গড়বেন সেই রাজনৈতিক দল ও বোদ্ধাদের মধ্যকার বিভাজনের মাত্রা চোখে পড়ার মতো। ফলে স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ থেকে স্বৈরাচার বিদায় নিয়েছে। দেশের মানুষ এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে গণতন্ত্র সুসংহতকরণসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের সংস্কারের কাজ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের জনগণ আশা করে বর্তমান সরকার সংস্কারের মাধ্যমে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলবে।



