- অতিদ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া উচিত : নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো: আব্দুল আলীম
- দলীয়করণের মাধ্যমে পুরনো বন্দোবস্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে সরকার : সিনিয়র আইনজীবী ও সেন্টার ফর সিভিল রাইটসের মহাসচিব ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় একইভাবে আত্মগোপনে চলে যান তৎকালীন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা। এতে শূন্য হয়ে পড়ে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এসব পদ। জনসেবা অব্যহত রাখতে এসব পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। প্রায় দুই বছর ধরে এসব পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন তারাই।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। সরকার গঠনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল অতিদ্রুত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দেয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও একই কথা বলা হচ্ছিল। গত ১ মার্চ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছিলেন, ঈদের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেয়া হবে।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ সিটিসহ দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে ছয়জন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দেয় বিএনপি সরকার। এরপর ১৪ মার্চ আরো পাঁচটি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই দলটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তারাই আবার স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচনে প্রার্থী হবেন বলে জানা যাচ্ছে।
দলীয় যে পদে আছেন ১১ সিটির প্রশাসক : বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ), রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মাহফুজুর রহমান রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের রুকুনোজ্জামান রোকন ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব, রংপুর সিটি করপোরেশনের মাহফুজ উন নবী চৌধুরী রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মো: ইউসুফ মোল্লা কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মো: আবদুস সালাম বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মো: শফিকুল ইসলাম খান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনের পরাজিত প্রার্থী, খুলনা সিটি করপোরেশনে নজরুল ইসলাম মঞ্জু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে পরাজিত প্রার্থী, সিলেট সিটি করপোরেশনে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মো: সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মো: শওকত হোসেন সরকার গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকরা স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪-এর ধারা ২৫ক-এর উপধারা (৩) অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। তারা বিধি মোতাবেক ভাতা পাবেন।
অবশেষে গত ১৫ মার্চ দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই বিএনপির জেলাপর্যায়ের নেতা বা দলটির রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন এমন প্রায় একডজন প্রার্থীকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
এ ছাড়া সারা দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে অন্তত দেড় হাজারে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কোথাও কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন। বাকি প্রায় তিন হাজার ইউনিয়নে আগের চেয়ারম্যানরা দায়িত্বে ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিলে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাদের মতে, স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে নির্বাচনভিত্তিক প্রতিনিধিত্বই বেশি গ্রহণযোগ্য।
যা বলছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা : নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো: আব্দুল আলীম নয়াদিগন্তকে বলেন, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের এসব পদে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়োগ দেয়া বেআইনি নয়। এসব পদে থেকে যেহেতু জনগণের জন্য কাজ করতে হয় এ জন্য যারা জনগণের সমস্যা বুঝতে পারে তাদেরই থাকা উচিত। এ জন্য আমি মনে করে অতিদ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের এই পদে কাজের সুযোগ দেয়া প্রয়োজন।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সেন্টার ফর সিভিল রাইটসের মহাসচিব ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির নয়া দিগন্তকে বলেন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলে আসছে তারা সংবিধানের বাইরে যাবে না। জাতীয় নির্বাচনের পরপরই বিএনপি মহাসচিব বলেছিলেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেয়া হবে। কিন্তু এটি না করে এখন স্থানীয় সরকারে দলীয় লোকদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সব কিছুতে দলীয়করণের কারণেই জুলাই আন্দোলন হয়েছিল। জুলাই আন্দোলনের কথা মুখে বললেও বিএনপি এটি ধারণ না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় দলীয়করণের মাধ্যমে পুরনো বন্দোবস্তের দিকে ফিরে যাচ্ছে। দলীয়করণ বন্ধ করে অতিদ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব দেয়া উচিত বলে মনে করেন এই আইনজীবী।



