আমেরিকান মুসলিমরা যেভাবে সহিংসতা মোকাবেলা করছে

আলজাজিরা বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে বন্দুকধারীদের গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার পর শোকের আঁচ তখনো কাটেনি- ঠিক সেই মুহূর্তে বাল্টিমোরে ২৫ হাজারেরও বেশি মার্কিন মুসলিম একত্রিত হলেন ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার (আইসিএনএ) বার্ষিক সম্মেলনে। ইসলামোফোবিয়ার ক্রমবর্ধমান ঢেউয়ের মুখে শোককে শক্তিতে এবং ভয়কে সঙ্কল্পে পরিণত করার আহ্বান ছিল এই সমাবেশের মূল সুর।

কাউন্সিল অব আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্সের (কেয়ার) আইনজীবী লেনা মাসরি সম্মেলনে বলেন, সান ডিয়েগোর হামলায় নিহত তিনজন- নিরাপত্তা কর্মকর্তা আমিন আব্দুল্লাহ, মনসুর কাজিহা ও নাদির আওয়াদ- অন্যদের বাঁচাতে নিজেদের জীবন দিয়েছেন। আমিন হামলাকারীদের সাথে গুলি বিনিময় করেন, আর মনসুর ও নাদির আহতদের সাহায্যে ছুটে গিয়ে জরুরি সেবায় ফোন করেন। মাসরি বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে শুধু সমবেদনার চেয়েও বেশি ঋণী- আমরা তাদের কাছে দৃঢ় সঙ্কল্পের ঋণী। তারা মসজিদ, স্কুল, শিশু ও মুসল্লিদের রক্ষা করেছেন। তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে হলে আমাদের উপাসনার অধিকার, কথা বলার অধিকার এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার রক্ষায় নেমে আসতে হবে।’

ইসলামোফোবিয়া ও ফিলিস্তিন : একই শিকড় : সম্মেলনজুড়ে ফিলিস্তিনের প্রতীক ছিল সর্বত্র- তরমুজ ও পতাকার ছবি আঁকা ব্যাগ, কেফিয়া নকশার স্কার্ফ ও পানির বোতল। একটি বিশেষ তাঁবুতে সংহতির বার্তা সংগ্রহ করা হয়, যা লাইফ ফর রিলিফ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে গাজায় পাঠানো হবে।

বক্তারা যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম-বিদ্বেষ এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও লেবাননে ইসরাইলের নির্যাতন- এই দুইয়ের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক আলতাফ হুসাইন বলেন, ‘ফিলিস্তিনবিরোধী কণ্ঠস্বরগুলো মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে ইসরাইলের সমালোচনা বন্ধ করতে চাইছে। কিন্তু এই বিশাল সমাবেশ প্রমাণ করছে- এই সম্প্রদায় ভীত নয়, পিছু হটবে না।’

মুসলিম সম্প্রদায় ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সাড়ে ৩৫ লাখ ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে পদক্ষেপ নিয়েছে।

ঘৃণার রাজনীতি ও আইনি লড়াই

হামলার পর ডানপন্থী ভাষ্যকার লরা লুমার সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারকে লক্ষ্যবস্তু করতে অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানান এবং সমস্ত মুসলিমকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়নের দাবি তোলেন। এর মধ্যে ৬০ জনেরও বেশি কংগ্রেস সদস্য ‘শরিয়া-ফ্রি আমেরিকা ককাস’- এ যোগ দিয়েছেন এবং রাজ্যপর্যায়ে ফিলিস্তিনি অধিকার আন্দোলনকে শাস্তি দেয়ার চাপ বাড়ছে।

তবে আদালতে কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে। মার্চ মাসে ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস আইসিএনএকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যায়িত করলে সংস্থাটি মামলা করে। ফেডারেল বিচারক মার্ক ওয়াকার এই তকমা আরোপ থেকে বিরত রাখেন এবং রায়ে লেখেন, ‘ডিস্যান্টিসের নির্বাহী আদেশ পরোক্ষভাবে আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থার বাকস্বাধীনতা দমনের চেষ্টা করেছে। ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে, সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোই আক্রমণের সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।’

‘কথা বলার মূল্য আছে, কিন্তু চুপ থাকার মূল্য আরো বেশি’

সম্মেলনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বক্তব্য দেন ফিলিস্তিনি অভিবাসী লেকা কোরদিয়া। গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয়তার কারণে গত বছর অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে। এক বছরেরও বেশি সময় আইসিই হেফাজতে থাকার পর মার্চে একজন অভিবাসন বিচারক তাকে মুক্তি দেয়ার আদেশ দেন, তবে তিনি এখনো নির্বাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কোরদিয়া সমাবেশে বলেন, ‘মুখ খোলার একটা মূল্য আছে। আমাকে আমার স্বাস্থ্য, আমার স্বাধীনতা হারাতে হয়েছে। কিন্তু এটা সার্থক- কারণ চুপ থাকার মূল্য কথা বলার চেয়ে অনেক বেশি।’

তিন স্তরের নিরাপত্তা, অটুট সঙ্কল্প

আইসিএনএ সভাপতি সাদ কাজমি জানান, সম্মেলনটি সুরক্ষিত রাখতে সংগঠনের নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষী, একটি বেসরকারি সংস্থা এবং বাল্টিমোর পুলিশ- এই তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয় নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হামলার পর মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। ‘আমরা এমন একটি দেশে বাস করি যা সংবিধান ও আইন দ্বারা শাসিত। এগিয়ে যাওয়ার পথ হলো নিজেদের ও সম্প্রদায়কে আরো শক্তিশালী করা।’

নিউ জার্সির ইমাম টম ফাচিন সম্মেলনে বলেন, ‘অধিকার হলো একটি ভূখণ্ড- আপনি সক্রিয়ভাবে তা দখলে না রাখলে তা কেড়ে নেয়া হবে। আর ঠিক এটাই এখন ঘটছে।’