ভোটের বাকি ২৭ দিন অপ্রস্তুত জাতীয় সংসদ

সরকার থেকে সংসদ ভবনের সংস্কার শেষ করার জন্য গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দেয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ সঙ্কট, কারিগরি জটিলতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে কাজ পিছিয়ে পড়ে। চলতি মাসে সংসদ ভবন সংস্কারকাজের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে কত দিনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

কাওসার আজম
Printed Edition
  • সংস্কার কাজ শেষ করতে দৌড়ঝাঁপ অনিশ্চয়তা উচ্চকক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে
  • ভোটের আগেই প্রস্তুতি হবে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২৭ দিন বাকি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সে হিসাবে মার্চের প্রথম দিকেই নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা। কিন্তু সেই অধিবেশন আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদ ভবন এখনো প্রস্তুত নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় বছর হতে চললেও এখনো সেই ক্ষত নিয়ে ভবনটির ভেতরে-বাইরে চলছে সংস্কারকাজ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত বিভাগের মধ্যে দায়িত্ব ও অগ্রগতি নিয়ে টানাপড়েন চলছে। অন্য দিকে, নির্বাচনের উত্তেজনার মধ্যেই সংসদ ভবনের প্রস্তুতি ঘিরে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা ও নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট তথা উচ্চকক্ষ হলে সেটির প্রস্তুতি নাই বললেই চলে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্বিকক্ষ নিয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তাই জাতীয় সংসদের বর্তমান অবস্থাকে ধরেই সংস্কার কাজ বা প্রস্তুতি চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় অধিবেশন কক্ষ, শপথকক্ষ, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কার্যালয়, সংসদীয় কমিটির দফতর, আইটি সেন্টার ও ভিআইপি কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষেই চলে ভাঙচুর। ধ্বংস হয় এসি, কম্পিউটার, ই-ভোটিং প্রযুক্তি, সম্প্রচারব্যবস্থা ও টেলিকম সংযোগ। ভেঙে ফেলা হয় মূল ভবনে প্রবেশের নিরাপত্তা সরঞ্জামও।

জাতীয় সংসদের অধীন এমপি হোস্টেল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনেও চালানো হয় ভাঙচুর। লুট হয় আসবাব, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত তহবিলের নগদ অর্থও। উদ্ধার হওয়া কিছু সামগ্রীর বেশির ভাগই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

এই ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির পর জাতীয় সংসদ ভবন ফের ব্যবহার উপযোগী করতে প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ৩০০ কোটি টাকার বেশি। পরে একাধিক সভা ও নিরূপণের মাধ্যমে দেখা যায়, সংসদ ভবন ও আবাসিক স্থাপনায় মোট ক্ষয়ক্ষতি ছিল প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব খাতের ক্ষতি হয় ৫০ কোটি টাকা এবং গণপূর্ত বিভাগের অধীন ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর সংসদ ভবনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সভা হয়, যেখানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয় এবং জরুরি সংস্কারকাজের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

সরকার থেকে সংসদ ভবনের সংস্কার শেষ করার জন্য গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দেয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ সঙ্কট, কারিগরি জটিলতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে কাজ পিছিয়ে পড়ে। চলতি মাসে সংসদ ভবন সংস্কারকাজের অগ্রগতি নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে কত দিনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা না গেলেও আগামী অধিবেশনের আগেই সংস্কার শেষ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। তাদের আশা, জানুয়ারির শেষ নাগাদ অন্তত অধিবেশন কক্ষসহ প্রধান ব্লকগুলোর কাজ শেষ করা যাবে। তবে সংসদ সচিবালয়ের মধ্যম পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, বাস্তব চিত্র আরো জটিল। তাদের মতে, পুরো কাজ শেষ করতে অন্তত আরো ছয় মাস সময় লাগতে পারে। কারিগরি অনেক বিষয় এখনো প্রস্তুত নয়, এমনকি কিছু কাজ শুরুই করা যায়নি। বাজেটের অপ্রতুলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি গণপূর্ত বিভাগের আওতায় থাকা কাজে নতুন ঠিকাদার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয়ের রেফারেন্স ব্যবহার করে কাজ করছে। এতে সংস্কারের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্কার দ্রুতগতিতে চললেও অধিবেশন কক্ষ, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নতুন আসবাব স্থাপন ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কাজ এখনো বাকি। ছাত্র-জনতার প্রবেশের সময় সংসদের চেয়ার, কার্পেট, গ্লাসসহ বিভিন্ন মূল্যবান আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুই আই কানের মূল নকশা অক্ষুণœ রেখে এসব মেরামত করতে বাড়তি সময় প্রয়োজন হচ্ছে।

এ দিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলো সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে মতামত দিয়েছে। সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তবে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উচ্চকক্ষ গঠনের জন্য সংসদ ভবনের কোন জায়গা নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা নেই। এমনকি প্রাথমিক প্রস্তুতি নেয়ার কথাও বলা হয়নি। ফলে এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কার্যত অন্ধকারে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ১৪ অথবা ১৫ ফেব্রুয়ারি নতুন এমপিদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই হিসাবে ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই সংসদ ভবনের ভেতরে শপথকক্ষ, ভিআইপিদের অফিসকক্ষ এবং সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলোর পাশাপাশি সংসদ অধিবেশন কক্ষের মেরামত কাজ শেষ করতে হবে। আর আগামী মার্চ মাসের প্রথম দিকে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের তেমন প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না।

সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন, সংসদের একটি বড় অংশের কাজ করছে গণপূর্ত বিভাগ। তারা ভালো বলতে পারবে। আমি এটুকু বলতে পারি, সংস্কারের কাজ এগিয়ে চলছে।

সংসদ ভবনের সংস্কারের দায়িত্ব পালন করা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাহিদ পারভেজ নয়া দিগন্তকে বলেন, সংস্কার কাজ দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলছে। আশা করছি, জানুয়ারি মাসের মধ্যেই শেষ হবে। না হলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে হবে।

তিনি জানান, সংসদ ভবনের ভেতরে অধিবেশন কক্ষ, শপথ কক্ষ, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির কক্ষ, সরকারি ও বিরোধী দলের সভাকক্ষসহ ভিআইপিদের অফিসকক্ষের কাজ জানুয়ারির মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

একইভাবে এমপি হোস্টেলসহ অন্য কাজগুলোও এগিয়ে যাচ্ছে।

গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অধিবেশন কক্ষে এমপিদের বসার ২৭টি চেয়ার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং সামনের সারির বেশির ভাগ টেবিল ভেঙে পড়ে। এগুলো নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। কার্পেটের কিছু অংশে আগুন দেয়ায় নতুন কার্পেট বসাতে হয়েছে। সাউন্ড সিস্টেম, সাইমুলটেনিয়াস ইন্টারপ্রিটিশন সিস্টেম (এসআইএস) ও মাইক্রোফোন ভেঙে ফেলা হলেও সেগুলোর সংস্কার শেষ হয়েছে। নতুন করে এসব বসাতে ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকা লাগত, কিন্তু সংস্কারের মাধ্যমে মাত্র চার কোটি টাকা ব্যয় হওয়ায় সরকারের প্রায় ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

বরাদ্দ সমস্যার কারণে কাজের গতি ব্যাহত হলেও গণপূর্ত বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এপিপির অর্থ দিয়ে জরুরি কাজ শুরু করা হয়েছে। লাইট, কাঠের কাজ ও সিভিল কাজের জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে। এমপিদের পুরনো হোস্টেল, সচিব হোস্টেল ও ন্যাম ফ্ল্যাটের মেরামত কাজও ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। এরই মধ্যে স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয় মেরামত শেষ করে ব্যবহারোপযোগী করা হয়েছে।

জানা যায়, শুধু সংস্কার কাজ করবে গণপূর্ত বিভাগ। আর সংসদের বিভিন্ন অফিসের আসবাবপত্র বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা করবে সংসদ সচিবালয়। জাতীয় নির্বাচনের যে সময় বাকি রয়েছে, এই সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন করা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সংসদ ভবনকে অন্তত কার্যকর অবস্থায় আনতে চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো। তবে পুরোপুরি আধুনিক ও ‘স্মার্ট পার্লামেন্ট’ হিসেবে গড়ে তুলতে আরো কয়েক মাস সময় লাগবে। নির্ধারিত সময়ে সংস্কার কাজ সম্পন্ন না হওয়ার পেছনে সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্তের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও অন্যতম কারণ বলে মনে করেন অনেকে।