নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজায় যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা সম্প্রসারণে বেসামরিক মানুষের জীবন আরো ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলো। তাদের যৌথ সমন্বয় সংস্থার মতে, এসব এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ইসরাইলি বাহিনী প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করছে। খবর আলজাজিরার।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত ইসরাইলি সেনা মোতায়েন থাকা এলাকার আশপাশে হামলায় অন্তত ১৯৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন নারী ও ৪৩ জন শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইলের বিধিনিষেধের কারণে ত্রাণ ও চিকিৎসাসহ জরুরি মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ত্রাণকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় কয়েকটি সংস্থা তাদের কার্যক্রম সীমিত বা সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
অধিকাংশ ফিলিস্তিনি একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়ে ছোট ছোট এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন, যেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সেবার তীব্র সঙ্কট রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং গাজাজুড়ে বাধাহীন মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। এ দিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও মানবিক সহায়তায় বাধার প্রতিবাদে সুইডেনের স্টকহোমে বিক্ষোভ করেছেন শত শত মানুষ।
নিহত বেড়ে ৭৩০৯০
এ দিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় একটি ড্রোন হামলায় মোহাম্মদ নাজিব আশুর নামে এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। একই দিনে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার কাছে নিখোঁজ থাকা আরো দুই ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার করা হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় সাতজন নিহত, ধ্বংসস্তূপ থেকে আরো ৯টি লাশ উদ্ধার এবং ১৬ জন আহত হয়েছেন। এতে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হাজার ৯০ এবং আহতের সংখ্যা এক লাখ ৭৩ হাজার ৫৫৩ জনে পৌঁছেছে।
দুই হামাস যোদ্ধাকে হত্যার দাবি
অন্য দিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, গত সপ্তাহে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় পৃথক দু’টি বিমান হামলা চালিয়ে হামাসের দুই প্রতিরোধ যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যভিত্তিক এই হামলাগুলোতে হামাসের গুরুত্বপূর্ণ দুই সদস্য নিহত হন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নিহতদের একজন মুহাম্মদ নাজিব আশুর এবং অন্যজন তামির সাঈদ আবু নাহাল। তাদের দাবি, আশুর হামাসের নুখবা ইউনিটের একজন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, আর আবু নাহাল হামাসের একটি সেলের প্রধান ছিলেন এবং সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিতেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর আরো দাবি, নিহত এই দুই ব্যক্তি ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের সাথে জড়িত ছিলেন। সেই কারণেই তাদের লক্ষ্য করে পৃথক বিমান হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সামরিক কর্তৃপক্ষ।
পশ্চিমতীরে ঘরবাড়ি ধ্বংস
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিমতীরেও ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী। ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ জানায়, বৃহস্পতিবার আইন আল-হিলওয়ে এলাকায় ইসরাইলি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও সেনাবাহিনী কয়েকটি আবাসিক ভবন, গবাদিপশুর খামার এবং পানির ট্যাংক ধ্বংস করে। অভিযানে মুখোশধারী কয়েকজন বসতি স্থাপনকারীও অংশ নেয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
ফিলিস্তিনের আল-দাঘামেহ পরিবারের পক্ষে করা আবেদনের পর সুপ্রিম কোর্ট দুই দিন আগেই উচ্ছেদ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছিল। পরিবারটির দাবি, তারা ১৯৬৭ সালের আগ থেকেই ওই জমিতে বসবাস করছে। মানবাধিকার সংগঠন বি’তসেলেম বলেছে, ইসরাইলের আইনব্যবস্থা দখলদার নীতিকে আইনি বৈধতা দিচ্ছে এবং আদালতের নির্দেশও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।
এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিমতীরে গতকাল রোববারও ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, নাবলুসের দক্ষিণে আল-জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি রেস্তোরাঁয় হামলা চালিয়ে নগদ অর্থ লুটের পর সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এতে প্রায় তিন লাখ ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই দিনে রামাল্লার সিনজিল এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা গবাদিপশু নিয়ে ফিলিস্তিনি বাড়িঘরের আশপাশে হামলা চালায়। হেবরনের মাসাফের ইয়াত্তায় একটি ফিলিস্তিনি বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি, এসব হামলা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বা সুরক্ষার মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে।
হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজা পুনর্গঠন নয়
ইসরাইলি বাহিনীর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে না। লেবানন ইস্যুতে ইসরাইল নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনায় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে আধুনিক বিশ্বের স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও ইসরাইল একসাথে দাঁড়ালে স্বাধীনতা আরো শক্তিশালী হয়।’ একই সাথে তিনি দাবি করেন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধীরা গণতন্ত্রকে দুর্বল মনে করলেও সেই ধারণা ভুল।
মিসর প্রেসিডেন্ট সতর্ক বার্তা
অন্য দিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসান না হওয়া পর্যন্ত দেশটির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। এক ভাষণে তিনি বলেন, স্থায়ী শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে দখলদারিত্বের অবসান, ফিলিস্তিনিদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৭৯ সালে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করা প্রথম আরব দেশ হিসেবে মিসরের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি ন্যায়ভিত্তিক শান্তিচুক্তির আহ্বান জানান এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর গাজার যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।



