‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে ফিরবেন না বলে জানিয়েছেন। গতকাল সচিবালয়ের প্রধান ফটক আটকে বিক্ষোভ করার সময় বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবীর এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে যে অপপ্রয়াস নেয়া হচ্ছে, আমরা তাদের এই অপপ্রয়াস রুখে দেবো, ইনশা আল্লাহ। এটি নিবর্তনমূলক আইন। এই অধ্যাদেশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমরা কাজে ফিরব না। আমরা সচিবালয়ে বাদামতলায় (৬ নম্বর ভবনের সামনে চত্বর) অবস্থান করব।’
সব ফটক আটকে সচিবালয় অচল করে দেয়ার হুমকিও দেন কর্মচারী নেতারা। তারা বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে অনেক উপদেষ্টা ও সচিবের সাথে কথা বলেছি; কিন্তু কেউ আমাদের আশ্বস্ত করতে পারেননি। আমরা বাধ্য হয়ে আন্দোলনের নেমেছি।’ যেকোনো মূল্যে এ অধ্যাদেশ প্রতিহত করা হবে।
২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন সংশোধনে অধ্যাদেশের খসড়া নিয়ে ক্ষুব্ধ সবপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কারণ অধ্যাদেশের খসড়ায় শৃঙ্খলা বিঘিœত, কর্তব্য সম্পাদনে বাধা, ছুটি ছাড়া কর্মে অনুপস্থিত, কর্তব্য পালন না করার জন্য উসকানির জন্য আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুতির বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
এ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংশোধিত আইনে অভিযুক্ত কর্মচারীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকছে। এ ছাড়া কোনো কর্মচারী সরকারের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে তার আপিল করারও সুযোগ থাকছে।
গত ২২ মে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সাপেক্ষে অনুমোদন দেয়া হলেও খসড়াটি পর্যালোচনার জন্য চারজন উপদেষ্টাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা হলেন- আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান।
সূত্র জানায়, অধ্যাদেশে বলা হয়েছে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য কার্যধারা গ্রহণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অথবা বিশেষ আদেশ দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি অভিযোগ গঠন করবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কেন দণ্ড দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে নোটিশ জারির সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জবাব দেবেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিগত শুনানি করতে ইচ্ছুক কি না তা উল্লেখ করবেন।
অভিযুক্ত কারণ দর্শালে তা বিবেচনার পর এবং ক্ষেত্রমতো ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হলে শুনানি গ্রহণের পর যদি নিয়োগকারী অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে অথবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত কারণ না দর্শিয়ে থাকেন তাহলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ নোটিশের মাধ্যমে প্রস্তাবিত দণ্ড কেন আরোপ করা হবে না, নোটিশ জারির সাত কার্যদিবসের মধ্যে তার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবেন। এরপর নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে কারণ দর্শালে তা বিবেচনার পর অথবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কারণ না দর্শালে নিয়োগকারী দণ্ড আরোপ করতে পারবেন।
কর্মচারীকে দণ্ড প্রদান করা হলে, তিনি দণ্ড প্রদান আদেশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কার্যদিবসের মধ্যে ওই আদেশের বিরুদ্ধে ধারা ৩৪-এর অধীনে আপিল করতে পারবেন এবং আপিল কর্তৃপক্ষ ওই আদেশ বহাল রাখতে, বাতিল করতে বা পরিবর্তন করতে পারবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কোনো কর্মচারীর অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে অন্তত সাত থেকে আটটি ধাপ পার করতে হয়। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়ার আগে বিভিন্ন তদবিরে শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সচিবালয়ে নানা দাবি নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের দাবিদাওয়া পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ দেয়ার জন্য এ-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গতকাল রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই কমিটি পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
এতে বলা হয়, সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত/সুপারিশ দেয়ার জন্য সরকারি কর্মচারীদের দাবিদাওয়া পর্যালোচনাসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হলো।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সভাপতি করে কমিটিতে একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-১ অধিশাখা), যুগ্ম সচিব (বিধি-১ অধিশাখা), যুগ্ম সচিব (মাঠ প্রশাসন, অভ্যন্তরীণ নিয়োগ ও নবনিয়োগ অধিশাখা), যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা), মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিবের নিচে নয়), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সচিবালয় ও কল্যাণ অধিশাখা) সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
এই কমিটি সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত ও সুপারিশ দেবে। কমিটি প্রতি মাসে একবার সভায় মিলিত হবে এবং প্রয়োজনে কর্মচারীদের উপযুক্তসংখ্যক প্রতিনিধির সাথে মতবিনিময় করতে পারবে। কমিটি প্রয়োজনীয় সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সচিবালয়ে ৬ নম্বর ভবনের সামনে বাদামতলায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়ো হতে থাকেন। সকাল ১০টা নাগাদ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীতে পূর্ণ হয়ে যায় সচিবালয়ের এ চত্বর। ১০টার কিছু পরে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের একাংশের সভাপতি মো: নূরুল ইসলাম ও মহাসচিব মো: মুজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মিছিল শুরু হয়।
এরপর সেখানে যোগ দেন সভাপতি বাদিউল কবীর ও মহাসচিব নিজাম উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত পরিষদের অপর অংশ। আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনসহ কর্মকর্তা- কর্মচারীদের অন্যান্য সংগঠন যোগ দেয় মিছিলে।
মিছিল করার সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘সচিবালয়ের কর্মচারী, এক হও লড়াই কর’; ‘অবৈধ কালো আইন, মানি না মানব না’; ‘আমাদের দাবি আমাদের দাবি, মানতে হবে মানতে হবে’- স্লোগান দিতে থাকেন।
৬ নম্বর ভবনের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সামনে দিয়ে নতুন ভবন, ক্লি¬নিক ভবনের সামনে দিয়ে ১১ নম্বর ভবনের সামনে আসেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তারা মিছিল নিয়ে সচিবালয় এলাকা প্রদক্ষিণ করতে থাকেন। এরপর তারা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিছিল নিয়ে ৪ নম্বর ভবনে গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সাথে তার দফতরে দেখা করতে যান। তবে তিনি দফতরে ছিলেন না।
পরে মিছিল নিয়ে তারা সচিবালয়ের এক নম্বর ফটক বা প্রধান ফটকের কাছে গিয়ে বসে পড়েন। সেখানে সংযুক্ত পরিষদ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বক্তব্য দেন।
এ সময় প্রধান ফটক বন্ধ করে দেন দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রায় ২০ মিনিটের মতো ফটক বন্ধ ছিল। এ সময় সচিবালয় থেকে কেউ বের হতে এবং প্রবেশ করতে পারেনি। পরে মিছিল নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৬ নম্বর ভবনের সামনে অবস্থান নেন।



