উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ও জনপ্রশাসনে বিশেষজ্ঞ সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মো: শরিফুল আলম বলেছেন, বাংলাদেশ একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর ছোট দেশ। এই দেশের সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যবহারিক অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। রাজনীতিকে করতে হবে মূল্যবোধকেন্দ্রিক। রাজনীতি রেন্ট বা বখরা আদায়ের হাতিয়ার হবে না। এটাই হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এ বন্দোবস্তে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রধান ভূমিকায় আসতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, জনগণ যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে অধিকার হারা না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এ সরকারকে করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
ড. শরিফুল আলম বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব এবং সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির (সিপিএএ) প্রেসিডেন্ট। তিনি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে তার অনেক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। বর্তমানে তিনি যৌথভাবে ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সঙ্কট’ নিয়ে ইংরেজি ভাষায় একটি পুস্তক সম্পাদনার কাজ করছেন। বইটি একটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা হতে প্রকাশিত হবে।
নয়া দিগন্ত : জুলাই বা বর্ষা বিপ্লবের প্রথম বছর পূর্তি হলো। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ নিয়ে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. মো: শরিফুল আলম : জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। তবে আমি মনে করি এ বিপ্লব পুরো বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের জন্য একটি অনন্য সাধারণ রাজনৈতিক বিষয়। আরব বসন্তের পর বাংলাদেশের এ বিপ্লব আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ঢেউ তুলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের ছাত্ররা এ বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করতে বাধ্য হবে। যা হোক, জুলাই বিপ্লবের মূল শিক্ষা হলো জন-অধিকার বঞ্চিত করে কোনো শাসক শ্রেণী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। যদিও চাকরির সুযোগের সমতা আদায়ের আন্দোলন থেকে এ বিপ্লবের সূচনা হয়, তবে খুব দ্রুত এটি একটি সামগ্রিক বিপ্লবে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত এ আন্দোলেনে শামিল হয়। এর প্রধান কারণ ছিল সমাজে অধিকারহীনতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়। ফলে জনগণ খুব অসহায় বোধ করছিল। রাষ্ট্রের সাথে জনগণের সম্পর্ক খুব দুর্বল অবস্থায় চলে যায়। শাসক শ্রেণী সম্পর্কের এ অবনমনকে ধরতে পারেনি। তারা মনে করেছিল রাষ্ট্রের যে নিবর্তনকারী রূপ আছে সেটি ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঠিক করবে। আবু সাঈদের শাহাদতের পর আমরা শাসক শ্রেণীর মধ্যে এ রূপটিই দেখতে পেয়েছি। কিন্তু মানুষ ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে তারা রাষ্ট্রের বা সরকারের নির্মমতাকে চ্যালেঞ্জ করবে।
বিগত শাসক শ্রেণী যেটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সেটি হলো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে রাজনীতিকে শূন্য করে দেয়া। এর ফলে রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। এরকম শূন্যতার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। তাই বর্ষা বিপ্লবের পর যে রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেটি আশানুরূপ ফল দিচ্ছে না। মানুষ যে আকাক্সক্ষা নিয়ে বিপ্লবোত্তর পরিবেশে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল তার যে অগ্রগতি তা মানুষকে নিশ্চিতভাবে আশাহত করেছে। তবে আমি মনে করি এখনো সময় আছে। হয়তো কিছু পরিবর্তন করা সম্ভব হবে।
নয়া দিগন্ত : যে ঐক্য জুলাই বিপ্লবকে সম্ভব করেছিল, তা পরবর্তীতে দুর্বল হয়েছে বলে অনেকে বলছেন। আপনার কি তাই মনে হয়? এ বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী?
ড. মো: শরিফুল আলম : বহু দিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সবাইকে জুলাই বিপ্লবে একত্র করেছিল। তবে বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে একই মাত্রার ঐক্য আশা করা ঠিক হবে না। প্রত্যেক রাজনৈতিক দল ও শক্তির লক্ষ্য যেহেতু ভিন্ন। তাই এ ভিন্নতাকে উপেক্ষা করা যাবে না। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে জুলাই বিপ্লবের একটি লক্ষ্য ছিল। সেটি ছিল সমাজে সুবিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এগুলো হচ্ছে এক ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও মূল্যবোধ। এসব মূল্যবোধ সব রাজনৈতিক শক্তির প্রধান চালিকা শক্তি হওয়া উচিত। সে দিক থেকে বললে আমরা এখনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য দেখছি। সবাই সংস্কারের ব্যাপারে কথা বলছে। ভিন্নতা আছে, কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করার অবস্থায় কেউ নেই। এটি জুলাই বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হলে ঐক্য রাখতে হবে। এবার রাজনৈতিক দলগুলো যদি রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে ব্যর্থ হয় তা হলে ইতিহাস এ ব্যর্থতাকে ক্ষমা করবে বলে মনে হয় না। তাই আমরা আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো প্রজ্ঞার পরিচয় দেবে।
নয়া দিগন্ত : সংস্কারের কথা যখন উঠল, তখন এর সাফল্য নিয়ে আপনার কী মনে হয়। সংস্কার নিয়ে কি আপনি আশাবাদী?
ড. মো: শরিফুল আলম : দেখুন সংস্কার প্রক্রিয়া যেভাবে চলছে তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। ঐকমত্য কমিশন ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে বসছে, কথা শুনছে। অপর দিকে দলগুলো তাদের মতামত দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ছিল না। সে দিক থেকে এটি একটি অগ্রগতি। এটাকে সাধুবাদ দেয়া প্রয়োজন। তবে হতাশার কথা হচ্ছে এখনো প্রধান বিষয়গুলোয় ঐকমত্য হচ্ছে না। সরকার যেহেতু আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচনের কথা বলছে, তাই সংস্কারের কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে এ বিপ্লবে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, অন্ধত্ব মেনে নিয়েছে। তারা শুধু সরকারের পরিবর্তনের জন্য এত ত্যাগ করেনি। জনগণ দেশের একটি গুণগত পরিবর্তন চেয়েছিল। ভোটাধিকার ও সুষ্ঠু ভোটের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের স্বাধীন অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। এ আকাক্সক্ষাটা সবাইকে জুলাই বিপ্লবে একত্র করেছিল। তাই সংস্কারকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত না। ফলে সংস্কারের অঙ্গীকারকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : এখন পর্যন্ত জুলাই সনদ হলো না, এটি আদৌ হবে কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। আপনি কি আশাবাদী?
ড. মো: শরিফুল আলম : জুলাই সনদ সবার চাওয়া ছিল। এটি শুরুতে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু নানা কারণে এটি হলো না। আপনি যে অনৈক্যের কথা বললেন, সেটির শুরু কিন্তু এখানে। সরকার বলেছে সবার সাথে আলোচনাক্রমে এ সনদ হবে। আমরা আশা করি এ মাসেই এ সনদ হওয়া প্রয়োজন। জুলাই সনদ এ সরকারের বৈধতার জন্যও জরুরি। যারা জীবন দিয়েছে, সংগ্রাম করেছে তাদের আকাক্সক্ষা জুলাই সনদে প্রাধান্য পাওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ পালন করতে হবে। আমরা আশা করি সরকার দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিবে।
নয়া দিগন্ত : আবার সংস্কার প্রশ্নে যাই। আপনি কি মনে করেন সংস্কারে সরকারের প্রায়োরিটির ঘাটতি আছে?
ড. মো: শরিফুল আলম : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি মনে করি আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের মূলে যেতে হবে। কেন আমরা রাজনৈতিক উন্নয়নে অগ্রগতি করতে পারলাম না এটি আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে। আমাদের সঙ্কট হলো আমরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর একচেটিয়াত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। এর ফলে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করতে হয়েছে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। সরকারকে নির্বিচারে মানবাধিকার হরণ করতে হয়েছে। আয়নাঘর আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কখনোই ছিল না। কিন্তু একচেটিয়া রাজনীতির কারণে এরকম নিবর্তনমূলক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। তাই রাজনীতিতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, একচেটিয়াত্ব খর্ব করা জরুরি। পাশাপাশি নির্বাচন ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য করা প্রয়োজন। এখন রাজনৈতিক ও কিছু কৌশলগত বিষয়ের সংস্কারে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এরকম সরকারের সময়ে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করে খুব লাভ হবে না। আর অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিলে রাজনৈতিক সংস্কার করা দুরূহ হবে। জনগণ যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে অধিকারহারা না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এ সরকারকে করতে হবে। এ অঙ্গীকার থেকে সরকার যাতে দূরে না যায় সে বিষয়ে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংস্কারের প্রধান বিষয়গুলো এখনই নির্ধারণ করে সেগুলো বাস্তবায়নের পর দ্রুত নির্বাচনে যাওয়া প্রয়োজন। সংস্কার ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া হবে আত্মঘাতী। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও জনগণের আকাক্সক্ষা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : বেশ কিছু রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবে অনৈক্য দেখা যাচ্ছে। যেমন প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন (পিআর) ব্যবস্থা, সংবিধান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইত্যাদি। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন।
ড. মো: শরিফুল আলম : আমি আগেই বলেছি আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটের গোঁড়ায় আছে একচেটিয়াত্ব মানসিকতা। তাই এ পটভূমির আলোকে সংস্কার প্রস্তাবকে দেখতে হবে। ভবিষ্যতে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ঠেকাতে হলে রাজনীতির ওপর মনোপলির সুযোগকে বিদায় করতে হবে। পিআর পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এটি রাজনৈতিক জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা তৈরি করতে সহায়ক হবে। বর্তমান পদ্ধতি আমরা তো অনেক বছর চর্চা করলাম। কিন্তু বাস্তবে তো উল্টা ফল দেখলাম। গণতন্ত্রের নামে রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেল। অর্থনীতি অলিগার্কদের হাতে চলে গেল। তাই বর্তমান বাস্তবতায় পিআর আমার কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য মনে হয়। শুরুতে এনসিসি নিয়ে আপত্তি থাকলেও পরবর্তীতে এটি পরিবর্তন করে ‘সংবিধান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি’ করা হয়েছে এবং এখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। এ প্রস্তাবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় একমত। সংবিধানসহ কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে হলে আমাদের এ কমিটির প্রয়োজন হবে। বিদগ্ধ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ন্যায়পালের কথা বলছেন। এটি নিয়েও আমাদের চিন্তা করা দরকার। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি অনেক পুরনো। গত আগস্টের পর থেকে বেশ কিছু প্রধান দল এটি নিয়ে কথা বলছে। বিগত নির্বাচনগুলোতে যেভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যূনতম শুদ্ধতা নষ্ট করা হয়েছে, তাতে এটি আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে নাও হতে পারে। কিন্তু শক্তিশালী স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য সুষ্ঠু নির্বাচন একটি আবশ্যকীয় শর্ত। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থাকেও দল-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আনা প্রয়োজন। অন্য দিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচন করেনি। আবার সিটি করপোরেশন নিয়ে বেশ খানিকটা বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছে। তাই, সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করলে নির্বাচন কমিশনের মান, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত। আমি মনে করি এটি সিরিয়াসলি বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে নিজের যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা প্রমাণের যে কোনো চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করা। আর একটি কথা না বললেই নয় সেটি হলো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন এবং কমিশনের কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই কমিশনের কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাধারণভাবে নির্বাচনের ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করা হয় এবং কমিশনের কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দেয়া হয়। কমিশনের কর্মকর্তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এটি নিয়ে এখন থেকে কাজ শুরু করা প্রয়োজন।
নয়া দিগন্ত : আপনি সরকারের সাবেক সচিব ছিলেন। প্রায় ৩৭ বছর সরকারি চাকরি করেছেন। প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে আপনার অভিমত কী।
ড. মো: শরিফুল আলম : ব্যক্তিগতভাবে আমি হতাশ। এবার একটা বিরাট সুযোগ ছিল প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কিছু গ্রহণযোগ্য মূল্যবোধের আলোকে ঢেলে সাজানোর। কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন সে সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছে। আমলাতন্ত্রে সমগ্র বিশ্বে প্রশাসনিক সার্ভিসের প্রাধান্য থাকে। সেটির ন্যায্য অনেক কারণ আছে। এ বিষয়ে অনেক গবেষণা আছে। উপসচিবের প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে অস্থিতিশীল করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে শুরুতে সংস্কার কমিশন ভুল বার্তা দেয়। এর মাধ্যমে এটিও স্পষ্ট হয় যে কমিশনের সদস্যদের আমলাতন্ত্রের তাত্ত্বিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা কম। সরকারের অনেকে এ সুযোগে আমলাতন্ত্রকে বৈরীভাবে গ্রহণ করে। তাই এ ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারের উচিত হবে সৎ, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তারা যাতে আস্থার সাথে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করা। বিগত সময়ে আমলাতন্ত্র নির্বিচার রাজনীতিকরণের কারণে পেশাদারিত্ব হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। এ বিষয়ে সিনিয়র সিভিল সার্ভেন্টদেরকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এর ফলে প্রশাসনে স্বাভাবিকতা নষ্ট হবে। আমরা শুনতে পাই হাইব্রিড মডেলে অনেকে কাজ করছেন। দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত অনেকে আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করতে চাচ্ছেন। এটি করা হলে খুব ভুল কাজ করা হবে। ভালো আমলাতন্ত্র ছাড়া ভালো রাজনীতি কোথাও প্রতিষ্ঠা হয়নি। তাই এই সাধারণ তত্ত্বকে সম্মান করতে হবে। দ্রুত মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাদেরকে সচিবপদসহ অন্যান্য উচ্চ পদে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।
উচ্চ পদে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন করাও কঠিন হবে। বিগত সময়ে অনেক সৎ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন এসব কর্মকর্তাকে এখন উচ্চ পদে পদায়ন করতে হবে। এসব কর্মকর্তাকে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তবে পদায়নের ক্ষেত্রে সততা ও দক্ষতাকে কোনোভাবেই অবজ্ঞা করা যাবে না। এগুলোকে সিভিল সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ ভ্যালুজ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে সিভিল সার্ভিসকে রক্ষা করতে হলে আরো গভীর গবেষণা করতে হবে; বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। আমলাতন্ত্রকে সমস্যা বিবেচনা না করে সমাধানের সূত্র হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের সিভিল সোসাইটি ও নাগরিক সমাজ অনেকটা স্বার্থগত দ্বন্দ্বে আমলাতন্ত্রের পেশাগত বিকাশ চায় না। তারা বর্তমান সময়টা কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে। তবে প্রকৃত বুদ্ধিজীবী সমাজ যারা শক্তিশালী ও দায়বদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামো দেখতে চায় তাদের দায়িত্ব হবে পেশাদার আমলাতন্ত্র গড়ার কাজে সহযোগিতা করা।
নয়া দিগন্ত : আমাদের রাজনীতির গুণগত রূপান্তরে আপনার পরামর্শ কী?
ড. মো: শরিফুল আলম : বিভিন্ন সঙ্কট আমাদেরকে আমাদের রাজনীতি ও সামগ্রিক অবস্থার ভঙ্গুরতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। এটা ঠিক যে বিগত পাঁচ দশক বা অধিক সময়ে আমরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারিনি। এর ফলে আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। নির্বাচনী ফলাফলে বহির্শক্তি হস্তক্ষেপ করেছে। এ থেকে আমাদের উত্তরণ জরুরি। তাই রাজনীবিদদেরকে আরো দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। বিভক্তির রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য অশনি সঙ্কেত। সেটি হলো আমরা রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সব সময়, ১৯৯০ সাল থেকে বলা যায়, একটি এলিট শ্রেণীর কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছি। এ শ্রেণীটি সাংস্কৃতিকগতভাবে সাধারণ মানুষ ও মূল্যবোধ থেকে অনেক দূরে। এ এলিট শ্রেণী মানসিকভাবে পরাধীন বা কলোনাইজড, পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। এরা প্রত্যক্ষভাবে পাশ্চাত্য শক্তির অনুদান নির্ভর এবং তাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নকারী। ফলে এ গোষ্ঠীটি বিভাজনের রাজনীতির প্রধান অনুঘটক। ১৯৭০ এর দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির বিভাজনে এ গোষ্ঠীটি সফট পাওয়ার হিসাবে কাজ করেছে। তাই এ গোষ্ঠীর দ্বারা দীর্ঘ মেয়াদে সমাধান পাওয়া কঠিন। তারা বরং রাষ্ট্রের ভঙ্গুরতাকে টেকসই করতে চাইবে, যাতে তারা ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে নিজেদের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। রাষ্ট্রের নীতি সক্ষমতা ও স্বাধীনতাকে এরা দুর্বল করতে চায়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে এ রাজনৈতিক-অর্থনীতিটা বুঝতে হবে। রাজনীতি নষ্ট হলে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে যায়। দেশ ও জনগণ উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই আমরা আশা করব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম রাজনৈতিক সংস্কার নিশ্চিত করে নির্বাচনে যাবে, যাতে দেশ নতুন করে কোনো সঙ্কটে নিপতিত না হয়। আগামী দিনে নতুন রাজনীতি করতে হবে যেখানে দক্ষিণ-এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিফলন থাকবে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে বিনির্মাণের সুযোগ দিতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেখাতে হবে। তরুণরা কর্মসংস্থান চায়; ভালো শিক্ষা চায়। এগুলো নিশ্চিত করা না গেলে আমরা সঙ্কট থেকে বের হতে পারব না। বাংলাদেশ একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর ছোট দেশ। তাই সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যবহারিক অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তাই রাজনীতিকে মূল্যবোধকেন্দ্রিক করতে হবে। রাজনীতি রেন্ট বা বখরা আদায়ের হাতিয়ার হবে না। এটিই হবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এ বন্দোবস্তে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রধান ভূমিকায় আসতে হবে।
নয়া দিগন্ত : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. মো: শরিফুল আলম : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।



