ইরানের ভূগর্ভের পরমাণু কেন্দ্রে হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের সুসংরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পরমাণু কেন্দ্র ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে’ শিগগিরই আঘাত হানা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মার্কিন গোয়েন্দারা ওই কেন্দ্রের প্রতিটি গতিবিধির ওপর নজর রাখছে এবং সেখানে কোনো সন্দেহজনক তৎপরতা শনাক্ত হলেই হামলা চালানো হবে।

গত ছয় মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, তেহরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা করাই ওয়াশিংটনের মূল উদ্দেশ্য। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, “ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাবে না। পিকঅ্যাক্সসহ ইরানের সব জায়গার খবর আমাদের কাছে আছে। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানব।”

এনডিটিভি লিখেছে, ইরানের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের কাছেই অবস্থিত এই ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’। পর্বতটির গভীরে দু’টি জটিল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ব্যবস্থা নিয়ে গঠিত এই কমপ্লেক্সটি আকাশপথে বোমা বর্ষণে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন।

গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলায় চালায়। তার জবাবে পশ্চিম এশিয়ার যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা রয়েছে, সেসব দেশে হামলা চালায় ইরান। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানির দামে উল্লম্ফন ঘটে। যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে সবশেষ জুনে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় পাল্টাপাল্টি হামলায়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ অবরোধের পাশাপাশি কঠোর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইরানের ওপর। এ ছাড়া আকাশ হামলাও চালানো হচ্ছে। এর মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পিকঅ্যাক্স পর্বতে হামলার হুঁশিয়ারি দিলেন।

মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দাদের ধারণা ইরান তাদের হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ পিকঅ্যাক্স পর্বতের নিরাপদ ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়েছে।

ফলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলার সিদ্ধান্ত পশ্চিম এশিয়ার সঙ্ঘাতকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

এর আগে জুলাই মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প পিকঅ্যাক্স পর্বত ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন।

মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়াকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে দাবি করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ না করলে ইসরাইল বা পুরো পশ্চিম এশিয়ার অস্তিত্ব থাকত না এবং তেহরানের পরবর্তী লক্ষ্য হতো ইউরোপ ও আমেরিকার শহরগুলো।

এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন সেনাদের ওপর আক্রমণের জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিমান প্রতিরক্ষা, রেডার, যোগাযোগকেন্দ্র, নৌ সরঞ্জাম এবং মাইন পুঁতে রাখার সক্ষমতা নিশানা করে জোরদার হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের রাডার ধ্বংসের প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, তাদের বাহিনী পরপর দুইবার তাদের অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ওই হামলার আগের কয়েক দিন কোনো গোলাগুলি চলছিল না। বারবার ধ্বংস হওয়ার পর ইরান এখন আর নতুন করে রাডার বসাতে সাহস পাচ্ছে না। অন্য দিকে মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তেহরান বলেছে, ওয়াশিংটন তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একাধিক প্রদেশে বেসামরিক এলাকা ও অসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের সশস্ত্রবাহিনী পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা ‘বিধ্বংসী আত্মরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে।

খারগ দ্বীপে হামলা

পারস্য উপসাগরে ইরানের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল রফতানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিপটিতে নিযুক্ত নিজেদের প্রতিনিধির বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম।

খারগ দ্বীপে নিযুক্ত তাসনিমের ওই প্রতিনিধি জানান, দ্বীপটির নোঙর এলাকায় তেলবাহী ট্যাংকারটিতে চারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে তাসনিম জানায়, এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত ট্যাংকার থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

ঘটনাটি নিয়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বিষয়টি নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও (সেন্টকম) তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

গত ৩১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই পোস্টের ক্যাপশনে তিনি দাবি করেছিলেন, খারগ দ্বীপ ‘ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে’। এর জবাবে খারগ দ্বীপে কোনো হামলা চালানো হলে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইরানি কর্তৃপক্ষ।

পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইরান। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটি তাদের মোট অপরিশোধিত তেলের ৯০ শতাংশই খারগ দ্বীপের মাধ্যমে রফতানি করত। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন অবরোধ শুরুর পর থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

গত ১১ জুন ট্রাম্প খারগ দ্বীপ দখলে নেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও পরে তিনি জানান, প্রস্তাবিত সামরিক অভিযানটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

ইরানের সামরিক নীতিতে পরিবর্তন

২০২৫ সালের জুন মাসের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের পর থেকে ইরান তাদের সামরিক দর্শনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। গতকাল শুক্রবার দেশটির সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, ওয়াশিংটনের যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি নস্যাৎ করতে তেহরান এখন ‘পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বা আক্রমণাত্মক’ হামলার কৌশল গ্রহণ করছে। জর্দান থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত পর্যন্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে সম্প্রতি চালানো হামলা এবং সেখানকার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে ইসরাইল ফের হামলা চালালে তার জবাব হবে আরো দ্রুত ও প্রখর।

সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত করে ট্রাম্পকে চাপে ফেলার ছক

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতকে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নেয়ার কৌশল নিয়েছে তেহরান। গোয়েন্দাদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকানদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে চায় ইরান। পাশাপাশি মার্কিন জনমতকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করতে ইরানি সাইবার দলগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আমেরিকানদের জীবনযাত্রায় এই সাইবার হামলার প্রভাবকে অত্যন্ত সীমিত বলে উল্লেখ করেছেন।

যুদ্ধপরবর্তী মধ্যপ্রাচ্য রূপরেখা তৈরি করছে ওয়াশিংটন

অন্য দিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে একটি সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক কৌশল সাজাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পরিকল্পনার মূল তিনটি লক্ষ্য হলো- যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানকে প্রতিহত করতে মিত্রদের এক ছাতার নিচে আনা, সৌদি-ইসরাইল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনসহ ‘আব্রাহাম আকর্ডস’-এর বিস্তার ঘটানো এবং গাজা ও লেবাননে স্থায়ী নিরাপত্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২৭ অক্টোবরের নেসেট নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, ওয়াশিংটন এই কৌশল বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা

ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের বিচার বিভাগীয় প্রধান গোলাম হোসেন মহসেনি এজেই মার্কিন ও ইসরাইলি হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানাতে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ দিকে তেহরানে সেনাপ্রধানদের এক অনুষ্ঠানে রিয়ার অ্যাডমিরাল সাইয়ারি দাবি করেন, কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও শত্রুপক্ষের সমস্ত অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে দেশের সশস্ত্রবাহিনী তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে সফল হয়েছে। এ ছাড়া সিস্তান ও বালুচেস্তান প্রদেশে মার্কিন ও ইসরাইল-সমর্থিত একটি সন্ত্রাসী দলের ওপর যৌথ অভিযান চালিয়ে তার দুই সদস্যকে নিহতের কথা জানিয়েছে আইআরজিসির কুদস বেস।