আলকামা সিকদার মধুপুর (টাঙ্গাইল)
এক সময় টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের শাল-গজারী বনের অন্যতম পরিচিত বনজ ফল ছিল ‘চাম্বল’ বা ‘চাম কাঁঠাল’। সুস্বাদু এই ফল শুধু বনবাসীদের জীবিকার অংশই ছিল না, বরং বানর, হনুমান, গন্ধগোকুলসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীরও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ছিল। তবে বন উজাড়, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সঙ্কুচিত হওয়া এবং নির্বিচারে গাছ নিধনের কারণে বর্তমানে এ ফলের গাছ বিলুপ্তির পথে। এক সময় যেখানে হাজার হাজার চাম্বল গাছ ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি গাছ টিকে আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি মধুপুরের সদর, চারালজানি ও রাজাবাড়ী বিট এলাকায় সরেজমিন চাম্বল গাছ ও ফলের সীমিত উপস্থিতি দেখা গেছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে মধুপুর সদর ও জলছত্র বাজারে অল্প পরিসরে এ ফল বিক্রি হলেও আগের মতো প্রাচুর্য আর নেই।
বনবিভাগ সূত্র জানায়, চাম কাঁঠাল দেখতে অনেকটা দেশীয় কাঁঠালের মতো হলেও আকারে ছোট এবং স্বাদে কিছুটা ভিন্ন। এক সময় মধুপুর বনজুড়ে এ ফলের ব্যাপক বিস্তার ছিল। বর্তমানে বাজারে যারা ফলটি চেনেন, তারা আগ্রহ নিয়ে কিনছেন। আবার অনেকেই এটি সম্পর্কে জানতে বিক্রেতাদের কাছে খোঁজ নিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রনি মিয়া বলেন, আগে মৌসুমে প্রচুর চাম কাঁঠাল পাওয়া যেত, এখন খুব কম দেখা যায়। নুরুল ইসলাম জানান, পাহাড়ি এলাকা থেকে সংগ্রহ করে বাজারে আনা হয় এ ফল। বর্তমানে প্রতিটি চাম কাঁঠাল ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জাতীয় উদ্যান সদর বিটের ডেপুটি রেঞ্জার মোশাররফ হোসেন জানান, রাজাবাড়ী বিট এলাকায় এখনো কয়েক হাজার চাম্বল গাছ রয়েছে। গাছগুলো ১০০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয় এবং মৌসুমে প্রচুর ফল ধরে। ফলটি স্বাদে কিছুটা টক হলেও বেশ সুস্বাদু।
স্থানীয় সাংবাদিক লিটন সরকার বলেন, এক সময় এই ফল বনের বানর, হনুমানসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর প্রধান খাদ্য ছিল। গাছ কমে যাওয়ায় প্রাণীরা খাদ্যের সঙ্কটে বন ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে এবং অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনায়ও প্রাণ হারাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ হোসেন জানান, চাম্বল গাছ আকারে অনেক বড় হওয়ায় ফল সংগ্রহ করা কঠিন। বর্তমানে জলছত্র, টেলকি, দোখলা, গায়রাসহ কয়েকটি পাহাড়ি এলাকায় অল্পসংখ্যক গাছ দেখা যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রকিব আল রানা বলেন, চাম কাঁঠাল একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ বনজ ফল। এতে ভিটামিন ‘এ’সহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা চোখের দৃষ্টিশক্তি ও ত্বকের জন্য উপকারী। তিনি বলেন, এ ধরনের দেশীয় বনজ ফল সংরক্ষণে বনবিভাগ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, মধুপুর গড়ের জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য রক্ষায় চাম্বল গাছ সংরক্ষণ, নতুন করে চারা রোপণ এবং বন উজাড় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।



