চরম অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও যান্ত্রিক বিভ্রাটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। দেশের সর্বোচ্চ আইনসভা যেখানে নির্বিঘœভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেখানে সাউন্ড সিস্টেম বিকল হয়ে স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করতে হয়েছে, যা সংসদের ইতিহাসে বিরল ও বিব্রতকর ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার কাজ শেষ করা, নিম্ন মানের হেডফোন ও মাইক্রোফোন ব্যবহার এবং বাজেট বরাদ্দ নিয়ে অস্পষ্টতার অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়েছেন সরকারি ও বিরোধী- উভয় দলের সংসদ সদস্যরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং প্রশাসনিক অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা। অনিয়মেরও অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরুর প্রথম দিন থেকেই সংসদ ভবনের প্লেনারি হলজুড়ে দেখা দেয় নানা ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার। সংসদ সচিবালয় ও গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সংসদ ভবনের প্লেনারি হলের সাউন্ড সিস্টেমটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চালু করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘শিওর’-এর তৈরি এই আধুনিক সিস্টেমটির স্বাভাবিক কার্যকাল ছিল প্রায় ১০ বছর। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতার মধ্যে সিস্টেমটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জানা যায়, আগে এই সাউন্ড সিস্টেম স্থাপনের কাজ করেছিল ‘কমিউনিকেশন টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশন শুরুর আগে ক্ষতিগ্রস্ত সিস্টেম মেরামতের দায়িত্ব দেয়া হয় ‘আমানত এন্টারপ্রাইজ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে। দীর্ঘদিন ধরে সংসদের প্রযুক্তিগত কাজ করা অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটিয়ে নতুন একটি কোম্পানিকে কাজ দেয়ার ঘটনায় শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে অনভিজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে সংস্কার কাজ যথাযথ মান বজায় রেখে করা হয়নি। এর ফলই দেখা যায় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই।
গত বৃহস্পতিবার স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রথমবারের মতো বক্তব্য দিতে গেলে পুরো সাউন্ড সিস্টেম বিকল হয়ে পড়ে। বারবার চেষ্টা করেও সিস্টেম সচল করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে স্পিকারকে একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করতে হয়। দেশের সর্বোচ্চ আইনসভায় স্পিকারকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে দেখে সংসদ সদস্যদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এই ঘটনায় ওই দিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহম্মেদ বিন কাসেম (আরমান) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে সংসদের সাউন্ড সিস্টেম ও হেডফোনের মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি লিখেন, সংসদের হেডফোনগুলোর মান এতটাই নিম্ন যে কিছুক্ষণ ব্যবহার করার পরই কানে ও মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। তার দাবি- শুধু তিনি নন, আশপাশে বসা আরো অনেক সংসদ সদস্য একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরও কেন এমন নিম্ন মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর পেছনে কারা লাভবান হয়েছে তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
সাউন্ড সিস্টেমের ত্রুটির কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কেও ওই দিন অধিবেশন চলাকালে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা যায়। অনেক সময় বক্তব্য স্পষ্টভাবে শোনা না যাওয়ায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদের এসি, লাইট, মাইক্রোফোন ও অডিও সিস্টেম উন্নয়নের জন্য মোট ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু হেডফোন ও ‘গুজনেক’ মাইক্রোফোনের পেছনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। কিন্তু এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ নাম না প্রকাশে স্বীকার করেছেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতার কারণেই মাইক্রোফোন ও হেডফোন ঠিকমতো কাজ করছে না।
শুধু সাউন্ড সিস্টেম নয়, সংসদ ভবনের সার্বিক ব্যবস্থাপনাতেও চরম দুর্বলতার চিত্র ফুটে উঠেছে। বাজেট স্বল্পতার অজুহাতে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন মৌলিক সুবিধাও সীমিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্লেনারি হলের ক্ষতিগ্রস্ত সিস্টেম পুরোপুরি সংস্কারের জন্য শুরুতে প্রায় সাড়ে ২২ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র চার কোটি টাকা দিয়ে কোনোমতে কাজ শেষ করা হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাতে হয়েছে।
গত রোববার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বর্তমান সাউন্ড সিস্টেম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সংসদের এই সাউন্ড সিস্টেম এখন সংসদ সদস্যদের জন্য এক বড় ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাথার ওপর এই ভারী হেডফোন পরে দীর্ঘ সময় বসে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর।
তিনি অভিযোগ করেন, আধুনিকায়নের নামে একটি সিন্ডিকেট লুটপাটের উদ্দেশ্যে এই বিশাল হেডফোনের ব্যবস্থা করেছে। তার মতে, ১৯৯১ ও ২০০১ সালের সংসদে কোনো হেডফোন ছাড়াই সুন্দরভাবে অধিবেশন পরিচালিত হয়েছে। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে এই ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যের সময় বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের অনেক সংসদ সদস্যকেও টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন দিতে দেখা যায়।
এ দিকে সংসদ সচিবালয়ের অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পিকার, হুইপ ও চিফ হুইপের দফতরেও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। এখনো স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের অনেক অফিস ও বাসভবনের পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি বলেও জানা যায়।
সংসদ কভার করা সাংবাদিকরাও নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন। আগে সংসদের প্রবেশপথ ও সাংবাদিক লাউঞ্জে টেলিভিশন মনিটর থাকায় সাংবাদিকরা সরাসরি অধিবেশন দেখে প্রতিবেদন তৈরি করতে পারতেন। কিন্তু নতুন অধিবেশনের প্রথম দুই দিন সাংবাদিকদের সাংবাদিক গ্যালারিতে বসে কিংবা সাংবাদিক লাউঞ্জে অডিও শুনে বক্তব্য লিখতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সুবিধাও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যদিও সংস্কার কাজের বড় অংশ গণপূর্ত অধিদফতরের দায়িত্বে ছিল, তবু সংসদ সচিবালয়েরও সমান দায় রয়েছে। অধিবেশন শুরুর আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ ও কাজের মান যাচাই করার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা ছিল স্পষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, সংসদ সচিবালয় নিজ দায় এড়িয়ে সবকিছু গণপূর্ত অধিদফতরের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে। অথচ কাজগুলো যথাযথভাবে তদারকি করা হলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি শুধু বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো কথা নাই’ বলেই মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।



