নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন ভিসি এ এস এম মাকসুদ কামাল, লেখক ড. জাফর ইকবালসহ আটজনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে তদন্ত সংস্থা। গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।
প্রতিবেদনটি যাচাই-বাছাই শেষে শিগগিরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।
আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, সাবেক বিচারপতি এ বি এম নিজামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। প্রসিকিউশন জানায়, এ ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করে তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বর্তমানে তা পর্যালোচনা চলছে। এরপর ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হবে।
জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন নিয়ে বিভ্রান্তি
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জাতিসঙ্ঘের ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ প্রতিবেদনের প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার নিয়ে সম্প্রতি দেশের কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে আংশিক ও বিভ্রান্তিকর বলে স্পষ্ট করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে প্রসঙ্গটি আদালতে উত্থাপিত হয়। প্রসিকিউশনের যুক্তি খণ্ডন ও বক্তব্যের পর গণমাধ্যমে সৃষ্ট ধোঁয়াশা কাটাতে পরবর্তীতে বিষয়টি পরিষ্কার করেন প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।
আদালতে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম উল্লেখ করেন যে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা চালানোর বিস্তারিত তথ্য জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ওই প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রত্যক্ষদর্শীদের পরিচয় বা মূল তথ্যসূত্র প্রসিকিউশন সরাসরি হস্তান্তর পায়নি।
কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখার কারণেই জাতিসঙ্ঘ এই প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য দেয়নি। তবে এই ব্যাখ্যার বিষয়ে প্রসিকিউটর তামীম পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানান, বিষয়টি কোনোভাবেই মৃত্যুদণ্ডের শর্ত সম্পর্কিত নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নীতি অনুযায়ী জাতিসঙ্ঘ মূলত প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার স্বার্থেই তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় বা স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ্যে আনেনি। কিছু সংবাদমাধ্যম তার বক্তব্যকে আংশিকভাবে উপস্থাপন করায় এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তবে জাতিসঙ্ঘের সরাসরি দেয়া তথ্য না পেলেও প্রসিকিউশন নিজস্ব তদন্ত ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত রেখেছে।
গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত নৃশংসতা বিশ্লেষণ করে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর (ওএইচসিএইচআর) একটি বিস্তারিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই অনুসন্ধান চালাতে জাতিসঙ্ঘের প্রতিনিধিদল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, সিলেট ও গাজীপুরসহ আটটি প্রধান শহরে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে। পুরো প্রতিবেদনে অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ২৩০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার এবং তৎকালীন প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংগৃহীত ৩৬টি পর্যালোচনামূলক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে পদ্ধতিগত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয়।



