ইমাম খোমেনির দিওয়ানে ইমাম : খোরশেদ মুকুল

Printed Edition
ইমাম খোমেনির দিওয়ানে ইমাম : খোরশেদ মুকুল
ইমাম খোমেনির দিওয়ানে ইমাম : খোরশেদ মুকুল

দিওয়ানে ইমাম কেবল একটি কাব্যসঙ্কলন নয়; এটি এক বিপ্লবীর হৃদয়ের আধ্যাত্মিক দিনলিপি। এই গ্রন্থে ইমামের লেখা ১৪৭টি গজল, ১১৮টি রুবাই, দু’টি মুসাম্মাত, একটি তারজিবান্দ, কয়েকটি কিতআ ও কতিপয় বিক্ষিপ্ত বয়েত সঙ্কলিত হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলোর আধ্যাত্মিক ও রূপক শব্দগুলোর টিকা লিখেছেন আলী আকবার রাশাদ। এখানে প্রেম কখনো রূপক, কখনো পরমসত্তার প্রতি নিবেদিত আকুলতা; মদ ও সাকি কখনো তাসাউফি প্রতীক, কখনো আত্মবিস্মৃতির ভাষা। পারস্যের শাস্ত্রীয় কাব্যঐতিহ্যের ধারায় নির্মিত হলেও এই কবিতাগুলোর স্বর ব্যক্তিগত ও অনন্য। রাজনৈতিক সংগ্রামের দৃঢ় উচ্চারণের বিপরীতে এখানে আমরা পাই এক বিনম্র, অশ্রুসজল, আত্মনিবেদিত মানুষকে। এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে খামেনির ব্যক্তিত্বের এক অনুদ্ঘাটিত দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তাকে কেবল ইতিহাসের নেতা হিসেবে নয়; বরং অন্তর্জাগতিক সাধক ও শিল্পরসিক স্রষ্টা হিসেবে মূল্যায়নের পথ সুগম হয়। বাংলা ভাষার কবি, গবেষক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের জন্য এই সঙ্কলন এক নতুন অন্বেষার দুয়ার খুলে দেয়- যেখানে বিপ্লব ও ভক্তি, রাজনীতি ও রুহানিয়াত, সংগ্রাম ও সৌন্দর্য একই স্রোতে মিলিত হয়েছে। হৃদয়ের খানকায় তিনি বলেন-

ওগো সাকি! বের করে দাও আমার হৃদয়ের বাসনা ব্যথা

তোমার রসের বাটি খুলে দিক সব রহস্যের জট।

দিলের খানকায় বুদ্ধির দৌড় বেঁধে দাও তরলিত মদে,

কখনো এই উন্মাদের আখড়া যুক্তির নিবাস হবে না।

এই পঙ্ক্তিমালায় ‘সাকি’ পরম সত্তার প্রতীক, আর ‘রসের বাটি’ মারেফতের নূরানি সুধা। কবি হৃদয়ের বাসনা-ব্যথা মোচনের জন্য ঐশী অনুগ্রহ প্রার্থনা করছেন- যেন সেই সুধা পান করে অন্তর্লোকের সব রহস্যের জট খুলে যায়। ‘দিলের খানকায় বুদ্ধির দৌড়’ বেঁধে দেয়ার আহ্বান যুক্তিনির্ভর অহমিকার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে প্রেমময় আত্মসমর্পণের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত; কারণ এই ‘উন্মাদের আখড়া’ অর্থাৎ- প্রেমাসক্ত হৃদয়-কখনো নিছক যুক্তির নিবাস হতে পারে না।

ইমামের কবিতা বিষয় ও ভাবরসের এক অপার ভাণ্ডার। এতে অনাদি জগতে আল্লাহর সাথে রুহগুলোর প্রথম প্রতিজ্ঞার ব্যাখ্যা যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি প্রথম মানবের ঈর্ষণীয় মর্যাদা ও সম্মানের বিবরণও পেয়েছে দীপ্ত প্রকাশ। বেহেশত ছেড়ে আসার বিচ্ছেদ ও বিরহের যন্ত্রণা, মাটিতে নির্বাসনে প্রবাস ও নিঃসঙ্গতার বেদনা, প্রাকৃতিক জগতের সঙ্কীর্ণতায় দারুণ মনঃক্ষুণœতা- এসব অনুভব তার পঙ্ক্তিমালায় গভীর আর্তনাদ হয়ে ধ্বনিত। বিচ্ছেদের কাতর কান্না, মিলন প্রত্যাশায় অস্থিরতা ও উদ্দীপনা, দারিদ্র ও অমুখাপেক্ষিতা- এসবের পাশাপাশি তিনি লোকদেখানো সংসারবৈরিতা ও ভণ্ডামির তিরস্কার করেছেন, আত্মপ্রীতি ও আত্মকেন্দ্রিকতার সমালোচনায় হয়েছেন কঠোর। আল্লøাহর পরিচয়তত্ত্বে প্রধান প্রতিবন্ধকতার পরিচয় নিরূপণ, বুদ্ধিচর্চার তুচ্ছতা প্রমাণ, গদিনশীন হয়ে সিলসিলা পূজার নিন্দা এবং ধর্মীয় শিক্ষকতায় অহমিকার তীব্র সমালোচনা তার কবিতায় সুস্পষ্ট। মারেফাত ও জগৎ জীবনের রহস্য সন্ধানে ভুল পথের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি আপেক্ষিক জ্ঞানের গুরুত্বহীনতার স্বরূপ উদঘাটনও করেছেন। নাক্সের তিরস্কার ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার নিন্দা যেমন আছে, তেমনি প্রেমের প্রশংসা, নৈতিক শুদ্ধির উপদেশ এবং জাগতিক সম্পর্ক ত্যাগের অনুপ্রেরণাও সমান শক্তিতে উচ্চারিত। আত্মিক প্রাণ-উচ্ছলতা, মাদকতা ও আনন্দময়তার বর্ণনা তার কাব্যে এক বিশেষ সুর এনে দেয়।

সব মিলিয়ে ইমামের এই কাব্যভুবন আমাদের সামনে এক বিস্ময়কর অন্তর্জগত উন্মোচন করে, যেখানে বিপ্লবীর দৃঢ়তা ও আরিফের অশ্রুসজল নিবেদন একই স্রোতে মিলিত হয়েছে। এখানে রাজনীতির উত্তাপ নেই, আছে আত্মার তাপ; এখানে বাহ্যিক সংগ্রামের স্লোগান নেই, আছে অন্তর্লোকের নীরব জিহাদ। তিনি যে বিষয়গুলো দর্শন, তাসাউফ বা নীতিশাস্ত্রের কঠোর পরিভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন, সেগুলোকেই রূপক, ইশারা ও বহুমাত্রিক দ্ব্যর্থকতার শিল্পভাষায় প্রকাশ করেছেন এই গ্রন্থে। ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছে একদিকে আধ্যাত্মিক মানচিত্র, অন্যদিকে আত্মসমালোচনার আয়না। পাঠক এতে নিজের নাক্স, অহমিকা ও ভ্রান্ত অন্বেষার প্রতিবিম্ব দেখতে পান; আবার একই সাথে খুঁজে পান প্রত্যাবর্তনের পথরেখা।