রয়টার্স
ইউক্রেন সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক সামরিক মানচিত্রে দেখা দিয়েছে এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ। যেখানে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কিয়েভের পেছনে অবস্থান নিয়েছে, অন্য দিকে মস্কোর পাশে সরাসরি শক্ত অবস্থান বজায় রেখেছে উত্তর কোরিয়া। আন্তর্জাতিক রণক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা সম্প্রসারণ করে উত্তর কোরীয় সেনারা এখন রাশিয়ার ভূখণ্ডে সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে মস্কোর পক্ষে পিয়ংইয়ংয়ের সেনা মোতায়েনের সংখ্যা ৫০ হাজারে উন্নীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সাল থেকেই রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, কামানের গোলা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল দেশটি।
২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া ন্যাটোর আদলে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। শর্তানুযায়ী, যেকোনো এক দেশের ওপর সামরিক আক্রমণ অপর দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। চুক্তি বাস্তবায়নের পর থেকে সরাসরি রণক্ষেত্রে সেনা পাঠায় পিয়ংইয়ং। দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের এই যৌথ কৌশলগত জোটে বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যা ইউক্রেনকে চরম কূটনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকিতে ফেলেছে। ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিটস্কি জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে রাশিয়ার ভেতরে সক্রিয় থাকা প্রায় সাড়ে ৮ হাজার উত্তর কোরীয় সেনার দলে একটি ড্রোন পরিচালনা ইউনিট রয়েছে, যারা ইউক্রেনীয় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। আগামী সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সম্ভাব্য বৈঠকে আরো ৫০ হাজার সেনা চাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। এটি বাস্তবায়ন হলে দুই দেশের মধ্যকার সামরিক যোগাযোগ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইউক্রেন চরম আকাশ প্রতিরক্ষা সঙ্কটে ভুগছে। অবশ্য মস্কোর এভাবে বিদেশী সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাকে নিজেদের দুর্বলতা হিসেবেই দেখছে কিয়েভ।
গোয়েন্দা তথ্য মতে, মোতায়েন করা উত্তর কোরীয় সেনাদল মূলত রাশিয়ার কুরস্ক সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থান করছে। এদের মাঝে এক হাজার প্রকৌশলী ও মাইন নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্য এবং ৪০০ জন অভিজ্ঞ ড্রোন চালক রয়েছে, যারা নজরদারি ও আকাশপথে হামলায় পারদর্শী। পিয়ংইয়ং ও মস্কোর এই নিবিড় সম্পর্ক ন্যাটো সদস্যদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঠিক এই সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছরে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উনের সাথে নতুন করে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার যৌথ সামরিক অনুশীলনের ব্যাপ্তি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ, উত্তর কোরিয়ার বাহিনী মূলত রাশিয়ান বাহিনীর পেছনের প্রতিরক্ষা ব্যূহ সামলানোর কাজ করবে, যাতে রাশিয়ার নিজস্ব সেনারা সরাসরি ইউক্রেনের ভেতরে নতুন করে হামলা জোরালো করতে পারে। স্কিবিটস্কি উল্লেখ করেন, বর্তমানে মস্কোর সামরিক ব্যবস্থায় প্রায় ২৫ হাজার উত্তর কোরীয় সৈন্যের মোতায়েন দেখা গেছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের অক্টোবরে কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় সেনাদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রথম উত্তর কোরীয় বাহিনী পাঠানো হয়। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়ার সার্বভৌম মাটিতে প্রথম বৈদেশিক অনুপ্রবেশের ঘটনা। কয়েক মাস নীরব থাকার পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইউক্রেন সঙ্ঘাতের অংশ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে। সে সময় প্রায় ১০ হাজার সেনা পাঠানো হয়েছিল এবং আক্রমণাত্মক আত্মঘাতী যুদ্ধ কৌশলের কারণে তাদের একটা বড় অংশ প্রাণ হারায়।



