বাসস
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা একটি দেশের প্রধান সম্পদ ও শক্তি। এটি উন্নয়নের ভিত্তি এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
তিনি গতকাল দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার আকারের ওপর নির্ভর করে না, বরং জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
তিনি বলেন, ‘অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়।’
তিনি ভারসাম্যপূর্ণ জনসংখ্যা নিশ্চিত করা এবং এর গুণগত মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অগ্রযাত্রার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তিনি বলেন, ‘তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তি কর্মসূচির অন্যতম দফা ছিল ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ’। ১৯৭৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন এবং ‘জনসংখ্যা নীতি’ প্রণয়ন করা হয়।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সুফল অর্জনের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। যার ফলে বাল্যবিবাহ কমে, সচেতনতা ও নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের প্রবণতা বাড়ে।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। সীমিত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর তুলনায় আমাদের জনসংখ্যার চাপ অত্যন্ত বেশি। এর সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, সীমিত বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবার পরিকল্পনা বা স্বাস্থ্যখাতের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এবং এই বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অর্থনীতির ভাষায় যা জনমিতিক লভ্যাংশ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীনের মতো বহু দেশ এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। তাই আজকের তরুণদের আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। আর তা করতে না পারলে এই সম্ভাবনাই একসময় বেকারত্ব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক বিনিয়োগ এবং সঠিক পরিকল্পনাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তি রচনা করবে। পরিকল্পিত পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন এই ছয়টি ভিত্তিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারলেই জনসংখ্যা জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর সরকারের সিদ্ধান্তকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।’
এর আগে রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যায়ে অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের মধ্যে ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করেন।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।



