মুহাম্মদ কামাল হোসেন
পৌষের আকাশ আজ নিথর। ভোরের কুয়াশা কোনো এক অসীম শোকের চাদর হয়ে ঢাকাকে জাপটে ধরেছে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো সেই কুয়াশা ভেদ করতে পারছে না। আব্দুল হামিদ ফজরের নামাজ শেষ করে জায়নামাজে স্থির হয়ে বসে আছেন। তসবিহ পাঠের আঙুলগুলো আজ বারবার থমকে যাচ্ছে। টেলিভিশনের স্ক্রলে সারারাত ধরে প্রবাহিত সংবাদটি এখন পাথরের মতো ভারী। বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই।
খবরটা শোনার পর হামিদের মনে হলো চার দিকের বাতাস হঠাৎ অক্সিজেনশূন্য হয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাস নিতে গিয়েও ফুসফুসে টান লাগছে। অথচ এই মানুষটির সাথে তার কোনো রক্তসম্পর্ক নেই। কোনো দিন সামনাসামনি দেখাও হয়নি। তবুও মনে হচ্ছে আজ নিজের অস্তিত্বের একটা বড় অংশ খসে পড়ল। এই মৃত্তিকার সবচেয়ে সাহসী জননী আজ চিরতরে বিদায় নিয়েছেন। দুচোখ ভিজে এলো শ্রাবণের ধারার মতো।
আব্দুল হামিদ একজন ক্ষুদ্র সরকারি কর্মচারী। পদমর্যাদা সামান্য। বেতনটাও তথৈবচ। মাস শেষে টানাটানি লেগেই থাকে। তিন ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী রেহানাকে নিয়ে এই মধ্যবিত্তের সংসার এক তালি দেয়া তাঁবু। এক দিক ঢাকলে অন্য দিক বেরিয়ে পড়ে। আজ বড় ছেলে আদনানের সেমিস্টার ফি। কাল মেজো মেয়ে তুলির গৃহশিক্ষকের বেতন। ছোট মেয়ে মালিহার অভাব তো বারোমাসি। সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। তবুও হামিদ সাহেব কখনো কারো কাছে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে তিনি আভিজাত্যের মতো লালন করেন।
অফিসে হামিদের সহকর্মীরা অনেকেই এখন বিত্তের পাহাড়ে চড়ে বসেছেন। পাশের টেবিলে বসা জহির সাহেব একই পদে যোগ দিয়েছিলেন। অথচ আজ জহির সাহেবের কবজিতে দামি ঘড়ি। যাতায়াতে পাজোরো। জহির সাহেব প্রায়ই বাঁকা হাসেন। হামিদকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই যুগে এত সততা দেখিয়ে কী লাভ হামিদ সাহেব? সততা দিয়ে তো আর ডাল-চাল কেনা যায় না। একটু নমনীয় হোন। দেখবেন দুনিয়াটা কত রঙিন।’
হামিদ সাহেব তার পুরনো আমলের ভাঙা সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন। এ সাইকেলটি কেবল লোহা আর চেইনের সমাহার নয়। এটি তার সততার এক অবিনাশী সাক্ষী। জহির সাহেবের পাজোরো গাড়ির চাকায় গতি আছে। হামিদের সাইকেলে সেই গতি নেই। কিন্তু তার সাইকেলের প্যাডেলে যে তৃপ্তি আছে, তা জহির সাহেবের নেই। তিনি জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী এক মানুষ। তার কাছে সততা কেবল শব্দ নয়। এটি এক পরম ইবাদত। তিনি যখন খালেদা জিয়ার সেই আপসহীন মুখটা দেখেন, তখন তার মনে হয় এই নারীই তো প্রকৃত দেশপ্রেমের বাতিঘর। ক্ষমতার মোহ তাকে টলাতে পারেনি। দীর্ঘ কারাবাস আর অসুস্থ শরীরেও তিনি নত হননি। একজন মানুষ যদি দেশের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তবে হামিদ কেন সামান্য অর্থের কাছে নিজের ঈমান বন্ধক দেবেন?
বাসায় ফেরার পথে বাজারের ব্যাগটি হাতে নিয়ে হামিদ সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। আজ বড় মেয়ে তুলির নতুন এক জোড়া জুতো কেনার কথা ছিল। পুরনোটা ছিঁড়ে পায়ে ফোসকা পড়ে গেছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন মাত্র কয়েকটি নোট অবশিষ্ট। এই টাকা দিয়ে জুতো কিনলে কাল অফিসের যাতায়াত খরচ থাকবে না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাজারের ব্যাগটি শক্ত করে ধরলেন। পৃথিবীতে দারিদ্র্য হয়তো বড় কষ্টের। তবে আত্মসম্মানহীনতা তার চেয়েও বড় গ্লানি।
বাসায় ঢুকতেই বড় ছেলে আদনান এগিয়ে এলো। আদনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। সে বাবার প্রতিচ্ছবি। বাবার দীর্ঘ সংগ্রামের নীরব সাক্ষী। আদনান টিউশনি করে নিজের খরচ মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। সে জানে তার বাবা কেন জহির সাহেবের মতো বিলাসী জীবন দিতে পারেননি। সে বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, ‘বাবা, আজ কি কিছু কিনেছ?’
হামিদ সাহেব মাথা নিচু করে বললেন, ‘না রে বাবা। কাল নেত্রীর জানাজায় যাবো। ভাবছি ওখানেই খরচটা লাগবে। তুলির জুতোটা কি আর কয়েকটা দিন চালানো যাবে না?’ আদনানের হৃদয় হু হু করে উঠল। সে জানে বাবার পকেটের অবস্থা। তবুও সে কিছু বলল না। আদনান বাবার কাঁধে হাত রাখল। এই স্পর্শে এক অদ্ভুত আশ্রয় ছিল। সে বলল, ‘চিন্তা কোরো না বাবা। তুলিকে আমি বুঝিয়ে বলব।’
রাতে খাবার টেবিলে বসে হামিদ সাহেব সন্তানদের দিকে তাকালেন। খুব সাধারণ ভাত আর ডাল। রেহানা বেগম হাসিমুখে পরিবেশন করছেন। এই অভাবের সংসারে রেহানাই মূল খুঁটি। তিনি কখনো অভিযোগ করেন না। স্বামীর সততাকে তিনি অতি যতেœ আগলে রাখেন। রেহানা জানেন হামিদের পকেটে টাকা না থাকলেও মনে এক বিশাল আকাশ আছে। সেই আকাশেই তিনি আশ্রয় খুঁজে পান।
হামিদ সাহেব খাওয়া শেষ করে আদনানকে কাছে ডাকলেন। ঘরের কোণে রাখা পুরনো একটি কাঠের বাক্স। সেখান থেকে তিনি একটি জীর্ণ খবরের কাগজ বের করলেন। সেখানে জিয়াউর রহমান আর খালেদা জিয়ার একটি দুর্লভ ছবি। তিনি ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখো বাবা, জীবনটা বড় বিচিত্র। মনে রাখবে, দেশ আর বিশ্বাস বড় দামি জিনিস। আমাদের নেত্রী আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে একা দাঁড়িয়েও পাহাড়ের মতো অটল থাকতে হয়। আমরা হয়তো অভাবী। তবে আমাদের শিরদাঁড়া যেন সবসময় সোজা থাকে। সততা কখনো পরাজিত হয় না। আজ যারা হাসছে, কাল তারা কাঁদবে। কিন্তু আমরা আজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচব।’
সরকার আজ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। স্থবির হয়ে আছে নাগরিক জীবন। অফিসের তাড়া নেই। ফাইলপত্রের স্তূপ আজ ডেস্কে পড়ে থাকবে অবহেলায়। অথচ আব্দুল হামিদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে গতরাত থেকেই। তিনি সারা রাত ঘুমাননি। ছুটির দিন মানেই যে বিশ্রাম, এ ধারণা আজ তার জন্য খাটে না। তিনি জানেন, আজ এক ঐতিহাসিক বিদায়ের দিন। সাদা পাঞ্জাবিটা পরম মমতায় ভাঁজ খুলে বিছানায় রাখলেন। যেন এক জনম পুরনো বন্ধুকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন। কুয়াশা যখন জানালার কাচ জাপটে ধরে কাঁদছে, তখনই তিনি তৈরি হয়ে নিলেন।
আদনান ঘরে ঢুকে বাবাকে প্রস্তুত হতে দেখে বলল, ‘বাবা, আমিও তোমার সাথে যাবো’। হামিদ সাহেব ছেলের দিকে তাকালেন। আদনানের চোখে এক নতুন দৃঢ়তা। তিনি খুশি হলেন। তিনি চান তার সন্তানরা এই ইতিহাস নিজের চোখে দেখুক। তিনি বললেন, ‘চলো বাবা। আজ এক মহীয়সী জননীকে বিদায় জানানোর দিন। আজ কেবল কান্নার দিন নয়; বরং তার ত্যাগকে নিজেদের রক্তে মিশিয়ে নেয়ার দিন। চলো, ইতিহাসের সাথে সাক্ষাৎ করে আসি।’
হামিদ সাহেবের মনে পড়ল আশির দশকের উত্তাল দিনগুলোর কথা। নেত্রী যখন এক জনসভায় অনেক দূর থেকে তাকে দেখেছিলেন। নেত্রী তখন বলেছিলেন, ‘দেশের জন্য ধৈর্য ধরুন। সত্যের জয় হবেই।’ সেই কথাটি আজও হামিদের কানে কোনো পবিত্র মন্ত্রের মতো বাজে। তিনি ডায়েরির পাতায় লিখে রেখেছিলেন সেই দিনগুলোর কথা। নেত্রী যখন এক জেল থেকে অন্য জেলে যেতেন। যখন তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হতো। তখন সাধারণ মানুষের মনে কী ভীষণ স্পন্দন উঠত। হামিদ সেই স্পন্দনের অংশ ছিলেন।
একবার তার অফিসে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি এসেছিলেন। একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সই করার বিনিময়ে তাকে অনেক বড় অঙ্কের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। হামিদ সাহেবের তখন ছোট ছেলেটি অসুস্থ। টাকার খুব দরকার ছিল। কিন্তু তিনি কলম ধরেননি। তিনি জানতেন সেই ফাইলে সই করা মানে দেশের মানুষের বিশ্বাসের সাথে বেঈমানি করা। পরদিন তাকে অনেক দূরে শাস্তিমূলক বদলি করা হলো। সে দিনও তার একমাত্র সঙ্গী ছিল ওই পুরনো সাইকেলটি। সেটি চালিয়েই তিনি মাইলের পর মাইল নতুন কর্মস্থলে গিয়েছিলেন। সেই সাইকেলের চাকায় ধুলো জমেছিল। তবে কলঙ্ক জমেনি।
তারা যখন বাসা থেকে বের হলেন, সূর্য কুয়াশার আড়াল থেকে বের হয়নি। রাজপথে মানুষের নদী বয়ে চলেছে। হাড়কাঁপানো শীতেও মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কোনো স্লোগান নেই। কোনো শোরগোল নেই। শুধু হাজার হাজার মানুষের পায়ে চলার ছন্দ। সবার গন্তব্য এক। হামিদ সাহেব রাস্তার এক পাশে এক বৃদ্ধ রিকশাচালককে দেখলেন। লোকটি রিকশার হ্যান্ডেলে মাথা রেখে নীরবে কাঁদছেন। হামিদ সাহেব তার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলেন। বৃদ্ধ লোকটি ভেজা গলায় বললেন, ‘বাজান, আমাদের মা জননী তো চলে গেলেন। এখন আমাদের কথা কে ভাববে?’ হামিদ সাহেবের গলা বুজে এলো। তিনি কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। এই ভালোবাসা কোনো জাগতিক হিসাবের তোয়াক্কা করে না। এটি এক গভীর আত্মিক বন্ধন। তিনি আদনানকে বললেন, ‘দেখো বাবা, একেই বলে জননেত্রী। যে মানুষের হৃদয়ে সিংহাসন পাততে পারে, মৃত্যু তাকে কখনো মুছে দিতে পারে না।’
বেলা বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা কিছুটা পাতলা হলো। কিন্তু মানুষের প্লাবন আরো বাড়ল। ঢাকার রাজপথ আজ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। নয়াপল্টন থেকে শুরু করে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষের মাথার ওপর দিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাসের ধোঁয়া উড়ছে। আব্দুল হামিদ আর আদনান ভিড়ের এক কোণে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছেন। চার দিকে এক পিনপতন নীরবতা। ঢাকার মতো এত ব্যস্ত শহরে এমন নিস্তব্ধতা অভূতপূর্ব। লাখ লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অথচ কারো মুখ থেকে কোনো টুঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে না। এই নীরবতাই আজ সবচেয়ে বড় চিৎকার।
হঠাৎ চার দিকে জানাজা শুরু হওয়ার ঘোষণা এলো। লাখ লাখ মানুষ এক নিমিষেই কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। হামিদ সাহেব প্রথম কাতারে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তিনি জানেন আল্লাহর দরবারে অন্তরের আর্তিই পৌঁছায়। তিনি আদনানের পাশে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন। ইমাম সাহেব যখন তাকবির দিলেন, পুরো প্রান্তর এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। এই নীরবতা হাজারো কান্নার চেয়েও শক্তিশালী। এই স্তব্ধতা আকাশ-বাতাসকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। হামিদ সাহেব অনুভব করলেন তার দু’গাল বেয়ে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
জানাজার মুনাজাত শেষ হতেই এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হলো। লাখ লাখ মানুষ যখন কাতার ভেঙে ধীর পায়ে সরতে শুরু করল, আব্দুল হামিদ সাহেবের বুকের ভেতরটা এক অপার্থিব তৃপ্তিতে ভরে উঠল। তিনি আদনানের হাতটা জড়িয়ে ধরলেন। প্রচণ্ড ভিড়। অথচ তার চোখে কোনো ক্লান্তি নেই; বরং একধরনের স্বর্গীয় দীপ্তি খেলা করছে। তিনি আদনানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘দেখলি তো বাবা? একেই বলে মানুষের নেত্রী। স্মরণকালে এমন জানাজা কি তুই আর কখনো দেখেছিস? আমরা আজ কেবল এক জননীকে বিদায় দিতে আসিনি রে। আমরা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক অধ্যায়ের অংশ হয়ে গেলাম।’
আদনান দেখল তার বাবার শীর্ণ মুখে আজ কোনো অভাবের ছাপ নেই। নেই কোনো জীর্ণতার গ্লানি; বরং এক বিশাল যুদ্ধের বিজয়ী সৈনিকের মতো তার বাবা আজ গর্বিত। হামিদ সাহেব আরো উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতে থাকলেন, ‘আদনান, বড় হয়ে তুই যখন তোর সন্তানদের গল্প শোনাবি, তখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারবি- তুই ওই দিনটিতে উপস্থিত ছিলি। তুই সেই জনসমুদ্রের সাক্ষী ছিলি। যেখানে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস এক হয়ে আকাশে মেঘ জমিয়েছিল। আজকের এ মুহূর্তটি আমাদের সারা জীবনের দারিদ্র্যের গ্লানি ধুয়ে মুছে দিলো রে বাবা।’
পিতা-পুত্রের এই আবেগঘন মুহূর্তে সময়ের চাকা থমকে দাঁড়িয়েছে। হামিদ সাহেব বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন আর বিড় বিড় করছেন। তিনি আজ নিজেকে খুব বড় মানুষ মনে করছেন। এই ইতিহাসের অংশ হতে পারাটা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। তিনি আদনানকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘টাকা দিয়ে মানুষ স্মৃতি কিনতে পারে; কিন্তু এমন গর্বিত ইতিহাস কিনতে পারে না। আজ আমি তোকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার দিয়ে গেলাম। এই জনসমুদ্রই তোর পাথেয় হয়ে থাকবে।’ আদনান বাবার উচ্ছ্বাস দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। সে বুঝতে পারল, আজ থেকে সে আর কেবল এক সামান্য কেরানির ছেলে নয়। সে এক কিংবদন্তি ইতিহাসের ধারক।
জানাজা শেষে তারা যখন ফিরছেন, এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। সাধারণ মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সান্ত¡না দিচ্ছে। কেউ কাউকে চেনে না। কিন্তু আজ সবাই এক পরিবারের সদস্য। হামিদ সাহেব বুঝতে পারলেন, এই মৃত্তিকা আজ তার সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে পরম মমতায় গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত। এই মাটির টান ছিঁড়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
পথে জহির সাহেবের সাথে আবার দেখা। জহির সাহেব গাড়ির ভেতরে বসে জানালার কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। তার চোখে আজ আর অহঙ্কারের ঝিলিক নেই; বরং একধরনের শূন্যতা আর বিষণœতা। তিনি হয়তো আজ বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতার বিলাসিতা দিয়ে মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা কেনা যায় না। হামিদ সাহেব তার দিকে তাকিয়ে একবারও হাসলেন না। তিনি শুধু নিজের পথে ধীরস্থিরভাবে হেঁটে চললেন। জহির সাহেব আজ বড় একা। আর আব্দুল হামিদ লাখো মানুষের ভিড়েও আজ বড় বেশি পূর্ণ।
সন্ধ্যা নামতেই শহরের আকাশ আবার কুয়াশায় ছেয়ে গেল। আব্দুল হামিদ সাহেব আজ আর ডায়েরি লিখলেন না। তিনি আজ আদনানের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘আদনান, আজ তুমি যা দেখলে তা সারা জীবন মনে রাখবে। মানুষের জন্য অকৃত্রিম মমতা থাকলে মানুষ কিভাবে শেষ বিদায়ে উজাড় হয়ে আসে, তা আজ প্রমাণিত। এই দৃশ্যই আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি দেবে।’
আদনান বাবার পায়ের কাছে বসে বলল, ‘বাবা, আমি আজ এক বড় সত্য উপলব্ধি করেছি। আমি ভাবতাম তুমি হয়তো আমাদের জাগতিক অনেক কিছু দিতে পারোনি। কিন্তু আজ বুঝেছি তুমি আমাদের যা দিয়েছ, তা পৃথিবীর সমস্ত সম্পদের চেয়ে দামি। তুমি আমাদের একটি আলোকবর্তিকা দিয়েছ। আমি এই আলো নিয়েই পথ চলব।’
হামিদ সাহেব হাসলেন। এই হাসিটা ছিল অত্যন্ত প্রশান্ত। তিনি জানেন, তার জীবনের পরম সার্থকতা এখানেই। তিনি সন্তানদের কেবল বড় হওয়ার মন্ত্র শেখাননি। ভালো মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিয়েছেন। আজ তিনি বিজয়ী। তার ত্যাগের বৃক্ষ আজ সফলতার ফল দিচ্ছে। তার মেজো মেয়ে তুলি আর ছোট মেয়ে মালিহাও বাবার পাশে এসে বসল। হামিদ সাহেব তাদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।
পরদিন সকালে হামিদ সাহেব যথারীতি অফিসের জন্য তৈরি হলেন। জহির সাহেবরা যখন দুর্নীতির চোরাবালিতে হারিয়ে যাবেন, তখন তাকে এই সামান্য বেতনের ওপর দাঁড়িয়ে সততার দুর্গ আগলে রাখতে হবে। তার পুরনো সাইকেলটি আজ যেন আরো সজীব হয়ে উঠেছে। সেটি যেন নতুন উদ্দীপনায় ঘুরছে। হামিদ সাহেব সাইকেল নিয়ে যখন অফিসের পথে রওনা হলেন, তার মনে হলো তিনি এক মহান সৈন্যদলের অংশ।
বিকেলে বাজার থেকে ফেরার পথে তিনি তুলির জন্য একজোড়া নতুন জুতো কিনলেন। পকেটে টাকা কম ছিল। তবুও আজ মনে কোনো দ্বিধা নেই। তিনি যখন বাসায় ঢুকলেন, দেখলেন আদনান তার ছোট বোনদের নিয়ে নেত্রীর একটি ছবি দেয়ালে সযতেœ টাঙাচ্ছে। ছবিতে নেত্রীর সেই চিরাচরিত হাসি। যে হাসি লাখ লাখ মানুষকে প্রেরণা দেয়।
রেহানা বেগম পাশ থেকে বললেন, ‘ওরা বলছে এই ছবিটাই আমাদের বাড়ির আসল গহনা। এই ছবি দেখলেই আমাদের সব কষ্ট দূর হয়ে যায়।’
আব্দুল হামিদ সাহেবের বুকটা আজ গর্বে ফুলে উঠল। তার ঘরটা ছোট হতে পারে। আসবাবপত্র জীর্ণ হতে পারে। কিন্তু এখানে এক অলৌকিক শান্তি বিরাজ করছে। তিনি জানালার বাইরে তাকালেন। পৌষের বিদায়ী হাওয়া বইছে। এই বাতাস আজ শুধু শীত বয়ে আনেনি। বয়ে এনেছে এক নতুন ভোরের মহিমা। এই ভোর সাহসের। এই ভোর মাথা নিচু না করার।
তিনি মনে মনে বললেন, হে জননী, আপনি বিদায় নেননি। আপনি বেঁচে আছেন আমার এই সাধারণ ঘরে। আমার সন্তানদের মননে। এই দেশের প্রতিটি ধূলিকণায়। মৃত্তিকার সাথে জননীর এই উপাখ্যান কখনো শেষ হবে না। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে চলবে এক অবিনাশী সত্য হয়ে। জননী আর মৃত্তিকার এই বন্ধন অবিনশ্বর। হামিদ সাহেব শান্ত মনে মাগরিবের নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। বাইরে তখন অন্ধকার নেমেছে। কিন্তু তার ভেতরের পৃথিবীটা আজ নূরে আলোকিত। এই নূরের নাম দেশপ্রেম। এই নূরের নাম আপসহীন ঈমান।



