বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে থাকা কানাডিয়ান কোম্পানির তৈরি অত্যাধুনিক মডেলের দু’টি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের হ্যাংগারে পড়ে আছে। পরিত্যক্ত এই এয়ারক্রাফট দু’টোর পেছনে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ লাখ লাখ টাকা ব্যয় হলেও এর বিপরীতে কর্তৃপক্ষ একটি টাকাও আয় করতে পারছে না। এক কথায় বহরে থাকা ১৯টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে এই দু’টি এয়ারক্রাফট নিয়ে অনেকটা বেকায়দার মধ্যেই রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। এই মুহূর্তে এয়ারক্রাফট দু’টি সচল করতে প্রয়োজন ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ। কিন্তু সেই ইঞ্জিনই সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ কোম্পানি থেকে আনতে পারছে না বিমানের সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দু’টি ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফটের মধ্যে একটিতে ইঞ্জিন লাগিয়ে সচল করা সম্ভব হলেও অন্যটি কোনোভাবেই সচল করা সম্ভব নয়। এটি স্ক্র্যাপ ঘোষণা ছাড়া আর বিকল্প পথ নেই! তবে এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের কোনো ধরনের দিক নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে না। যার কারণে এই দু’টি এয়ারক্রাফট নিয়ে প্রকৌশল বিভাগের পক্ষে আগ বাড়িয়ে কোনো কিছুই করনীয় নেই বলে সংশ্লিষ্ঠদের জানিয়ে দেন। এক সময় বিমানের বহরে থাকা পুরনো মডেলের ডিসি-১০ উড়োজাহাজ বিমানের বোঝা হয়ে পড়লে তখন সেটিকে স্ক্যাপ ঘোষণা করেই এয়ারপোর্ট থেকে সরানো হয়েছিল।
গত রোববার দুপুরের দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও ড. মো: সাফিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি টেলিফোন রিসিভ করেননি। পরে পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর মো: মনজুর-ই-আলমের সাথে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে অফিসিয়াল মাধ্যম ছাড়া তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
গতকাল হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রাফিক বিভাগের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে দু’টি ড্যাশ-৮ রানওয়ের অদূরে হ্যাংগারে পড়ে থাকার বিষয়ে শুধু বলেন, দু’টি না একটি সেটি আমি সঠিকভাবে বলতে পারব না। তবে বহরে থাকা সবগুলো উড়োজাহাজের মধ্যে ড্যাশ-৮ একটি অথবা দু’টি সবসময় বসেই থাকে। সার্ভিসেবল করে একটি উড়লে আরেকটি বসে থাকে। আসল খবর বিমানের প্রকৌশল বিভাগ ভালো বলতে পারবে।
খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কানাডিয়ান ‘প্রেট অ্যান্ড হুইটমে কোম্পানি থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ মোট পাঁচটি ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট তাদের বহরে নিয়ে আসে। এর মধ্যে যে দুটি এয়ারক্রাফট দীর্ঘদিন ধরে হ্যাংগারে পড়ে আছে সেগুলো ২০০৭ সালের আগে আনা হয়েছিল। এই দু’টো এয়ারক্রাফট একেবারেই বসে আছে। ঠিক করার চেষ্টা করা হলেও উড্ডয়ন উপযোগী করা যায়নি। বাকি তিনটি ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট দিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের ঢাকা থেকে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, সিলেট ও রাজশাহী রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করছে।
গতকাল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রকৌশল বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নয়া দিগন্তকে দু’টি ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট হ্যাংগারে অনেক দিন ধরে পড়ে থাকার সত্যতা নিশ্চিত করেন। ওই কর্মকর্তারা বলেন, আসলে এই এয়ারক্রাফট দু’টির একটিরও ইঞ্জিন সচল নাই। ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে অনেক আগেই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু উড়োজাহাজ মেরামতকারী কোম্পানি থেকে ওভারহোলিং ইঞ্জিনটি এখনো পাঠায়নি। তাদের মতে, ইঞ্জিন আনা সম্ভব হলে ড্যাশ-৮-(এ জে ডব্লিও) মেরামত করে উড্ডয়ন উপযোগী করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু অন্যটির (এ জে আর) সচল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। এটিকে বহর থেকে ফেইজ অ১াউট করতে হবে। এর বিকল্প নেই জানিয়ে তারা বলছেন, একসময় বিমানের বহরে নিজস্ব এয়ারক্রাফট ডিসি-১০ অচল হওয়ার পর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন সেটিকে স্ক্র্যাপ ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল। ড্যাশ-৮ এর বেলায়ও তেমনটি করতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে এই কর্মকর্তারা বলেন, এ ব্যাপারে বিমানের প্লানিং বিভাগ থেকে আমাদের কাছে কোনো মতামত দেয়নি। তবে ড্যাশ-৮ এর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে শুনছি অনেক দিন থেকেই। এখন এই বিষয়ে কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, গত বছরের আগস্টের আগে বিমানের বহরে থাকা কমপক্ষে ৮-১০টি এয়ারক্রাফট বার্ড হিটসহ নানা সমস্যায় পড়ে দেশে-বিদেশে যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়েছিল। ইনশাহআল্লাহ এখন ড্যাশ-৮ দু’টি ছাড়া আর কোনো এয়ারক্রাফটে কোনো ধরনের সমস্যা নেই। এখন শিডিউল বিপর্যয় হচ্ছে ঘন কুয়াশার কারণে। আমাদের এয়ারক্রাফটের সমস্যার কারণে কোনো ফ্লাইট বিলম্ব হচ্ছে না। কবে নাগাদ ইঞ্জিন আসতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, কানাডিয়ান কোম্পানি এই এয়ারক্রাফটের ইঞ্জিনের পার্টস ম্যানেজ করতে পারছে না। যদিও প্রেট অ্যান্ড হুইটমে কোম্পানিটি ইতোমধ্যে কিনে নিয়েছে ডি হ্যাভলেন্ট নামক কোম্পানি। তারা মনে করছেন, এক সময় এই এয়ারক্রাফটও স্ত্র্যাপ করে কেজি দরে বিক্রি করে দিতে হবে। বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে দু’টি পরিত্যক্ত ছাড়া বাকি ১৭টির মধ্যে দু’টি বোয়িং ৭৮৭-৮০০, চারটি ৭৮৭-৯০০, চারটি ৭৭৭-৩০০, চারটি ৭৩৭ এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ সচল রয়েছে।
গত রোববার দুপুরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের বিমানের বহরে এখন আর কোনো টেকনিক্যাল এয়ারক্রাফট নেই। দু’টি ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট পড়ে আছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমি জানি না। খোঁজ নিয়ে তারপর জানাতে পারব।



