নির্বাচন সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেই সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের ২৫৭টি তৈরী পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯৪টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে মালিকপক্ষ। আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত স্থানীয় নেতবৃন্দ ও একধরনের অশ্রমিক স্থানীয় লোকজনের যোগসাজশে ত্রয়োদশ নির্বাচন বানচাল করার ছকের অংশ হিসেবে শ্রমিকদের উসকে দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করা হতে পারে।

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition
নির্বাচন সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা
নির্বাচন সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

  • সব পণ্যের দাম বাড়ছে শুধু বাড়ছে না মজুরি
  • সরকারি কর্মচারীদের মতো শ্রমিকদেরও বেতন বৃদ্ধির দাবি
  • ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের হুমকি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে গার্মেন্টসশিল্প, টেক্সটাইলসহ দেশের অধিকাংশ মিল-কারখানার সাথে জড়িত শ্রমিক অঙ্গনে অসন্তোষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে, প্রতি বছর বাসাভাড়াও বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু ব্যয়ের তুলনায় শ্রমিকদের মজুরি সেভাবে বাড়ছে না। অনেক কারখানায় একাধিক মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে, সেগুলো আদায়ে প্রায়ই রাজপথে আন্দোলন করে শ্রমিকরা। ন্যূনতম মজুরি কাঠামোও অনেক কারখানায় পরিপালন হয় না। রয়েছে চরম আয়বৈষম্য। ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অর্থের অভাব আর অনটন যেখানে দিন আনে দিন খেটে খাওয়া মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী সেখানে তাদের সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া শুধু কঠিন নয়, দুঃসাধ্যও বটে। এ দিকে নির্বাচন বানচাল করার ছকের অংশ হিসেবে তাদের দাবিদাওয়াকে ইস্যু বানিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে দেয়া হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলের আশঙ্কা রয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশের সুতা উৎপাদনকারী মিলগুলোকে রক্ষায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করার অভিযোগ তুলে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএ। গেল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, আগামী ১ তারিখ থেকেই ফ্যাক্টরি বন্ধ। আমরা তো বন্ধ করবই, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়ার সক্ষমতা নেই। আমাদের পুঁজি অর্ধেক হয়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও শোধ করা যাবে না। সূত্রগুলোর দাবি, নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরো একটি সেক্টরের সব কারখানা বন্ধ শুধু স্বাভাবিক ঘটনা নয়, এর নেপথ্যে অন্যকোনো শক্তি কাজ করছে। কারখানা বন্ধ হলে বেতনভাতার দাবিতে রাস্তায় নামবে সংশ্লিষ্ট খাতের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এতে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গাজীপুরের একটি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিলে রাজধানীতে বিজিএমইএ কার্যালয়ের সামনে দুই শতাধিক শ্রমিক আন্দোলন করেন বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে। এভাবে আরো কারখানা নির্বাচনের আগে ঠুনকো অজুহাতে বন্ধ ঘোষণা করে শ্রমিকদের ফুসলিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ মনে করেন, নির্বাচন সামনে রেখে একটি মহল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্দেশ্যে শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। এ জন্য ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের নজিরবিহীন পতনের পর গামেন্টস-সহ বিভিন্ন শিল্প কারখানায় বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিকরা রাজপথে আন্দোলন করেন। যদিও ওই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন চিহ্নিত যুবলীগের নেতৃবৃন্দ। জানা গেছে, বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেই সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরের ২৫৭টি তৈরী পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ৯৪টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে মালিকপক্ষ। আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত স্থানীয় নেতবৃন্দ ও একধরনের অশ্রমিক স্থানীয় লোকজনের যোগসাজশে ত্রয়োদশ নির্বাচন বানচাল করার ছকের অংশ হিসেবে শ্রমিকদের উসকে দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করা হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গার্মেন্টস-শিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি বর্তমানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে আট টাকা ছিল। এই মজুরি কাঠামোতে গ্রেড সংখ্যা সাত থেকে কমিয়ে চারটি করা হয় এবং ডিসেম্বর ২০২৩ থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের শুরুতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ যুক্ত হয়েছে। অন্য দিকে বাংলাদেশে টেক্সটাইল মিলের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন বেতন খাত ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। কটন টেক্সটাইল (সুতা ও বস্ত্রশিল্প) সেক্টরের জন্য নিম্নতম মজুরি বোর্ড প্রায় ১০ হাজার টাকা সুপারিশ করেছে, যা অঞ্চলভেদে ভাতা (যেমন বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাবার) যোগ হয়ে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ (বিভাগীয় শহর) : প্রায় ১০ হাজার ৭০০ টাকা (পাঁচ হাজার টাকা মূল বেতন+ভাতা)। ইপিজেড (রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) : সুপারিশকৃত মজুরি : ১২ হাজার ৮০০ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাভারের এক গামেন্টস কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, হেমায়েতপুর এলাকায় আন্দোলন না হলেও সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে বকেয়া বেতনভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে যায়। এমনিতেই বেতন একেবারে কম তার ওপর ঠুনকো অজুহাতে প্রায়ই সেখান থেকেও কর্তন করা হয়। এ জন্য শ্রমিক অসন্তোষ রয়েছে। একজন শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার। এটা দিয়ে কি হয়! বাসাভাড়া দিতে গেলে তো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আর ঠিকমতো কেনা হয়ে ওঠে না। আরেক কর্মকর্তা বলেন, কর্মকর্তা লেভেলে কিছুটা বেতন বেশি হলেও শ্রমিক লেভেলে একেবারে কম, যা দিয়ে পুরো মাস পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালানো শুধু কঠিন নয়, দুঃসাধ্যও বটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বেড়েছে সেভাবে বেতন কারো বাড়েনি। তেল, চাল, ডাল, পেঁয়াজ-রসুনের দাম তো আমাদের দেশে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বৃদ্ধি পায়। গত কয়েকদিনে এলপিজি গ্যাসের দাম চলছে চড়া। একটি ১২ কেজি এলপিজির দাম সরকার নির্ধারণ করেছে এক হাজার ৩০৬ টাকা, ভোক্তাপর্যায়ে সেটি তিন হাজার ২০০ টাকাও বিক্রি হয়েছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তাহলে গরিব মানুষ বাঁচবে কিভাবে?

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন নয়া দিগন্তকে বলেন, সারা দেশে প্রায় ৩৭ লাখের মতো শ্রমিক রয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সরকার যে নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করেছে তাতে দেখা যায়, আগের তুলনায় সর্বনিম্ন ডাবলেরও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। গার্মেন্টস-শ্রমিকরা যে বাজারে বাজার করে সরকারি চাকরিজীবীরাও ওই একই বাজারে বাজার করে। তারা হয়তো একটু ভালো জায়গায় বসবাস করে, আবার শ্রমিকরা একটু তুলনামূলক কম ভালো জায়গায় বসবাস করে। কিন্তু বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম একই থাকে, সবাইকে একই দামে কিনে খেতে হয়। তিনি বলেন, যখনই পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে তখনই এই শিল্পের শ্রমিকদের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তখন হয়তো রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হতেও পারে। তবে বকেয়া বেতনভাতা পরিশোধের দাবিতে প্রায়ই শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। বিভিন্ন দাবিতে অসন্তোষ তো লেগেই আছে। বেতন বৃদ্ধির জন্য সরকারের উচিত, নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠন করা।