গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয়ের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- নতুন জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ কিভাবে গঠন হবে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থার প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ার মধ্য দিয়ে একটি নতুন সাংবিধানিক অধ্যায়ের সূচনা হলেও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তৃত বিতর্ক। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত মোট ভোটের ভিত্তিতে আসন বণ্টন হবে, নাকি নি¤œকক্ষে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে- এই প্রশ্নই এখন চারদিকে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জুলাই সংস্কার বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি-স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ অনুযায়ী, নাকি গণভোট-পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোটের আলোকে কার্যকর হবে, এটা নিয়েই চলছে আলোচনা সমালোচনা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আজ মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপি সরকারের নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
প্রাপ্ত ভোট না আসন অনুপাত : বিতর্কের মূল সূত্র
গণভোটের প্রশ্নপত্রে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল যে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ, জনপ্রিয় ভোটের অনুপাত অনুযায়ী ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনের কথা জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই প্রস্তাবেই ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের রায় একটি সুস্পষ্ট জনাদেশ বহন করে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়। রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এ দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ২৪টি রাজনৈতিক দল একমত হলেও বিএনপিসহ সমমনা কয়েকটি দল এ বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রেখেছে। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে আজ সরকার গঠন করছে। ভোটে বিজয়ের পর বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কথা না বললেও কোনো কোনো নেতা ও সংসদ সদস্য দলের ঘোষিত ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকেই সংস্কারের কথা বলছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে হলে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষে বিএনপি পেতে পারে ৫০টির বেশি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ৩৩টি আসন। অন্যদিকে নি¤œকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে হিসাব করা হলে বিএনপি পেতে পারে ৬৯টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী ২২টি। অর্থাৎ পদ্ধতির পার্থক্যে উচ্চকক্ষের রাজনৈতিক ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যেতে পারে।
জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রজ্ঞাপন : জুলাই সনদ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত একটি ঐকমত্যের দলিল, যেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়। সেখানে রাষ্ট্রের আইনসভায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে ৩০০ সদস্যের নি¤œকক্ষের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নি¤œকক্ষের সদস্যদের মতোই হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের নাগরিক, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স, ঋণখেলাপি নন এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত নন-এমন যে কেউ মনোনয়ন পেলে উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন।
অন্যদিকে গণভোট-পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপন রাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জারি হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে যে, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং রাষ্ট্রপতির অভিশংসনে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন লাগবে। উচ্চকক্ষ সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে, তবে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবে না। সাধারণ আইন পাসে সরাসরি ভোট দেয়ার ক্ষমতাও তাদের থাকবে না। অর্থাৎ, উচ্চকক্ষ হবে মূলত একটি পর্যালোচনামূলক ও সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষাকারী কক্ষ।
এখানেই বিতর্কের জায়গা তৈরি হয়েছে। জুলাই সনদ একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দলিল হলেও গণভোটের প্রজ্ঞাপন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনের ভাষ্যই অগ্রাধিকার পাবে, কারণ এটি জনগণের সরাসরি অনুমোদনপ্রাপ্ত।
সরকারের ব্যাখ্যা ও অবস্থান : প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, গণভোটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠন হবে এবং এর আইনগত ভিত্তি রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটে জনগণের সরাসরি মতামত সাংবিধানিকভাবে অধিক শক্তিশালী।
প্রধান উপদেষ্টার আরেক বিশেষ সহকারী এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করা অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সংবিধান সংস্কারে জনগণের প্রত্যাশাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। গণভোটের রায়কেই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া : জুলাই আদেশ অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেয়ার পর প্রথম ১৮০ কার্যদিবস একইসাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। এই সময়ে জুলাই সনদে বর্ণিত প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি প্রণয়ন করা হবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করার কথা রয়েছে।
আজ মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ২৯৭ জন নির্বাচিত সদস্যের গেজেট প্রকাশ করেছে। নতুন সংসদ কার্যকর হওয়ার পরই সংবিধান সংস্কারের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং সেই সংসদই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে উচ্চকক্ষ গঠনের বিধিবিধান।
সংবিধান বিশ্লেষকদের মতে, ভোটভিত্তিক বা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে আসন বণ্টন হলে উচ্চকক্ষে তুলনামূলক ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং জনপ্রিয় ভোটের প্রতিফলন ঘটবে। অন্যদিকে আসনভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করলে নি¤œকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল উচ্চকক্ষেও প্রাধান্য পাবে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য আনার মূল উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তারা মনে করেন, গণভোটের ভাষ্য উপেক্ষা করলে তা রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। একই সাথে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে উচ্চকক্ষ যেন রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে উচ্চকক্ষ গঠন এখন কেবল কাঠামোগত প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং জন-আস্থার বিষয়। গণভোটের রায়, জুলাই সনদের অঙ্গীকার এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি- এই তিন বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করবে জাতীয় সংসদই, সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে তাদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবসের কাজের মধ্য দিয়ে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের নতুন দ্বিকক্ষ সংসদব্যবস্থার চরিত্র ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্য।



