জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে

জুলাই বিপ্লব বিতর্কিত করার অপচেষ্টা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতন্ত্রের নতুন সূর্য উদিত হলেও, বিপ্লবের মূল চেতনাকে বিতর্কিত করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরাজিত শক্তির একটি অংশ, বিশেষ করে কিছু চিহ্নিত সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা কর্মীরা সঙ্ঘবদ্ধভাবে জুলাই আন্দোলনকে খাটো করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ইতিহাস এবং প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় জনমনে আবারো ক্ষোভ দানা বেধে উঠেছে।

৩৬ দিনের একটানা আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অবসান ঘটে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের। রক্তক্ষয়ী সেই জুলাই বিপ্লবের পর প্রায় দেড় বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সরকারের মাত্র চার মাস না যেতেই আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই পুরনো ফ্যাসিবাদীরা। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে জুলাই আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের গৌরবময় ইতিহাসকে বিতর্কিত করার একটি সুসংগঠিত অপচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনকে ‘বিদেশী চক্রান্ত’, ‘উগ্রবাদের উত্থান’ কিংবা ‘একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা’ হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চলছে। আন্দোলনের সময় সংঘটিত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের কিছু প্রশাসনিক দুর্বলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরো গণ-অভ্যুত্থানের যৌক্তিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা, নতুন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী কিছু সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা কিংবা প্রবাসে থাকা কর্মীরা সমন্বিতভাবে এ প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ‘আলো আসবেই’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির ঘনিষ্ঠ শিল্পীরা আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। সম্প্রতি ওই গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি জুলাইবিরোধী পোস্ট দিয়েছেন। একইভাবে একটি টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি জুলাই আন্দোলনের মোটিভ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এ ঘটনায় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ দানা বেধে উঠেছে।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সজিবুর রহমান বলেন, প্রথমে কোটা এবং পরে ছাত্রদের ওপর সরকারের ফ্যাসিবাদী মনোভাব ও হত্যার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলন গড়ে ওঠে। ওই আন্দোলন ঠেকাতে শেখ হাসিনার আওয়ামী সরকার প্রায় দুই হাজার মানুষকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করেছে। ৩০ হাজারের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মারপিটে আহত হয়েছে। অনেকে পঙ্গু ও অন্ধ পর্যন্ত হয়ে গেছে। অথচ সেই ফ্যাসিবাদী শাসনের সমর্থক গোষ্ঠী আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনকে নানাভাবে বিতর্কিত করতে চাচ্ছে। অথচ এত মানুষ মারা যাওয়া ও আহত হওয়ার কারণে তাদের অনুশোচনা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু তাদের মনে কোন ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই তারা এভাবে দুঃসাহস দেখাচ্ছে। বর্তমান সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইমরুল কায়েস বলেন, জুলাই বিপ্লব কোনো একক দলের সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের সাড়ে সতেরো কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের সুপ্ত ক্ষোভ ও অধিকার আদায়ের সম্মিলিত বিস্ফোরণ। শত শত শহীদের রক্ত ও হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব বরণের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেয়ার যেকোনো চক্রান্ত রুখে দিতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে অংশ নেয়া ব্যবসায়ী সিরাজুম মনির বলেন, জুলাই বিপ্লবে শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ, তাদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং আন্দোলনের একটি রাষ্ট্রীয় শ্বেতপত্র বা প্রামাণ্য দলিল তৈরি করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে এই আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত না হয়।

আন্দোলনে অংশ নেয়া একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী শাফায়াত হোসেন বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। তবে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে উভয় পক্ষকেই এক সুতায় বাঁধতে হবে। রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং জাতীয় ঐক্যই পারে সব ধরনের অপপ্রচার ও ইতিহাস বিকৃতির কুৎসিত প্রচেষ্টাকে চিরতরে নস্যাৎ করতে।