- সীমাহীন দুর্নীতি করেও বহাল তবিয়তে
- সনদে স্থাপত্যবিদ হয়েও কাজ করছেন নগর পরিকল্পনাবিদের
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাগত সনদে তিনি স্থাপত্যবিদ হলেও ২২ বছর ধরে তিনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালন করছেন। তার নিয়োগে ও পদোন্নতির প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে নানা অসঙ্গতি।
সূত্র জানায়, গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিরাজুল ইসলাম ডিএসসিসির অন্তত দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এসব প্রকল্পে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন নগর প্রশাসন। তৎকালীন সরকারদলীয় দুই মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাঈদ খোকনকে ম্যানেজ করে বারবার পার পেয়ে গেছেন তিনি। এমনকি নকল সনদে ছাত্রলীগের এক নেতাকে প্রকল্পের প্রকৌশলী নিয়োগ দিলেও সে ব্যাপারে নীরব ছিল ঢাকা দক্ষিণের নগর প্রশাসন।
ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যালের নাম করে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্পের অন্তত ৩৮ কোটি টাকা লোপাটেরও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভুল পরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকারের বিপুল টাকা ও সময়ের অপচয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলামের এই দুর্নীতির অভিযোগ চাপা পড়ে থাকলেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তার এই দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সূত্র জানায়, সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে একাধিক মেয়র পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন আসেনি প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদে। সবাইকে ম্যানেজ করেই বছর বছর ধরে প্রধান নগর পরিকল্পানবিদ পদটি অতিরিক্ত দায়িত্বের নামে আঁকড়ে ধরে আছেন সিরাজুল ইসলাম নামে এই কর্মকর্তা। আর এ পদটি ব্যবহার করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। প্রকল্পের নামেও শত কোটি টাকা দুর্নীতি ও আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ১৯৯৭ সালের জুন মাসে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনে একটি স্থপতি পদের (ষষ্ঠ গ্রেড) জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ওই পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়-কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্য বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রিধারী হতে হবে। কোনো সরকারি/ আধাসরকারি/ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নগর স্থাপত্যবিষয়ক কাজে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
কিন্তু সিরাজুল ইসলাম কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেননি। তিনি তৎকালীন রাশিয়া, বর্তমানের ইউক্রেন খারকভ ইনস্টিটিউট থেকে ৩০ জুন, ১৯৯৪ সালে স্থাপত্য বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ডিগ্রি অর্জনের মাত্র তিন বছর পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ায় ওই পদের জন্য সংশ্লিষ্ট কাজে তার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার সুযোগ নেই।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবেদন করার মতো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকলেও অদৃশ্য শক্তি ও আর্থিক মেকানিজমের মাধ্যমে তিনি ১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর নিয়োগপত্র পেয়ে ২৯ ডিসেম্বর স্থপতি পদে যোগদান করেন।
সরকারি যেকোনো নিয়োগ প্রদানে বিদেশী ডিগ্রি থাকলে, তা সমমান কি না-এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা উপেক্ষা করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ষষ্ঠ গ্রেডের স্থপতি পদটি তিনি দখলে নেন।
শুধু তাই নয়, বিগত ১৮ অক্টোবর ২০০৪ ইং তারিখে তৎকালীন ডিসিসির এক দাফতরিক চিঠিতে তাকে চতুর্থ গ্রেডের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়। ১ ডিসেম্বর, ২০১১ সালের ডিসিসি বিভাজিত হয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম শুরু হলে, সঙ্গত কারণেই ওই দাফতরিক চিঠিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। অতঃপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কোনো আদেশপ্রাপ্ত হননি। ফলে তখন থেকেই পদটি শূন্য রয়েছে। অথচ গত প্রায় ২২ বছর ধরে কোনো বৈধ দাফতরিক আদেশ ছাড়াই তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদটি অনেকটাই জোরপূর্বকভাবে দখলে রেখেছেন।
সূত্র বলছে, অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সমপদ/সমগ্রেডের হতে হয়। কিন্তু সিরাজুল ইসলামের স্থপতি পদটি ষষ্ঠ গ্রেডের আর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ-পদটি চতুর্থ গ্রেডের। বিধি মোতাবেক অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয় মূলত স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতার বলে গত প্রায় ২২ বছর যাবৎ সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে তিনি ওই পদে বহাল রয়েছেন।
এদিকে সিরাজুল ইসলামের দুর্নীতির বিষয়ে খতিয়ে দেখছে দুদক। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হওয়ায় বড় বড় প্রকল্পে সিরাজুল ইসলামকে দায়িত্ব দেন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও ব্যারিস্টার তাপস। প্রায় এক হাজার কোটি টাকার আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্প (২০১৫-২০২৩), প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট-ডিসিএনইউপি (২০০৯-২০১৪), ৮০০ কোটি টাকার নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ প্রকল্প- কেইস (২০০৯-২০১৪) এবং প্রায় আট কোটি টাকার ইন্টিগ্রেটেড মাস্টার প্ল্যান ফর ঢাকা (২০২০-২০২৩) প্রকল্পের পরিচালক করা হয় তাকে। বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তিনি একই সময়ে তিনটি বড় প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিকল্পনাবিদের চেয়ারে বসে প্রকল্পের সরকারি টাকা লোপাট করেছেন তিনি।
ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে জানতে তার মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।



