নিজস্ব প্রতিবেদক
বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের চেতনা ও জনগণের আকাক্সক্ষা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। শুরুতেই জাতির সাথে দেয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে পাঁচ বছর সেই অঙ্গীকার কিভাবে রক্ষা করা হবে? বিএনপিকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল রোববার রাজধানীর কাকরাইল মোড়স্থ হোটেল রাজমনি ঈশা খাঁ হোটেলে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ৬৯ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সেই জনরায়কে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো পুরো জুলাই আন্দোলনকেই অস্বীকার করা। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন না থাকলে আজকের জাতীয় সংসদও থাকত না, এমনকি অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগও সৃষ্টি হতো না। যে চুক্তিতে তারা স্বাক্ষর করেছে সেটি মেনে নিলে জনগণের আস্থা বজায় থাকবে। অন্যথায় জনগণ আস্থা হারালে নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিতে বাধ্য হবে।
নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দলটি অনেক কষ্ট বুকে চেপে নির্বাচনের ফল আপাতত মেনে নিয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব ধরনের অন্যায় মেনে নেয়া হবে। অন্যায় হলে আইনিভাবে, সংসদে ও রাজপথে লড়াই করা হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ নির্বাচনে মানুষ যে ভোট দিয়েছে তার সঠিক প্রতিফলন ফলাফলে আসেনি। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মতো সংস্থাও প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি সাবেক সরকারের এক উপদেষ্টাও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি- জনগণ যাদের সংসদে পাঠাতে চেয়েছিল তাদের ভোটের ফলাফল ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আগে যে সমঝোতা হয়েছিল সেখানে একই দিনে গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। পাশাপাশি নির্বাচিত ব্যক্তিরা একই দিনে দু’টি শপথ নেবেন- প্রথমে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে এবং পরে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে। এ চুক্তিতে বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলই স্বাক্ষর করেছিল। শুরুতে জাতির সাথে দেয়া অঙ্গীকার এখন কেন প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। তিনি বিএনপিকে অনুরোধ করে বলেন, নিজেদের অবস্থান সংশোধন করে সেই অঙ্গীকার মেনে নেয়া উচিত।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনের সাথে কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না। জনগণকে, বিশেষ করে জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেয়া মানুষদের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি বলেন, আমরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে পারি, কিন্তু জুলাইকে ত্যাগ করব না। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই আমরা এগিয়ে যাব।
সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ কিছু ‘অঘটন’ ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরকে হঠাৎ বদলি করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তার এক উপদেষ্টাকে অপমানজনকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পুরো কমিশন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে গুরুত্ব দেয়া হলে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি যে দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত তাকে সেই জায়গায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। সরকার যদি জনগণের অনুভূতি ধারণ করে দেশ পরিচালনা করে, তাহলে জামায়াতে ইসলামী সহযোগিতা করবে। অন্যথায় অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, জাতি বর্তমানে একটি সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্ত অতিক্রম করছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। জাতীয় নেতৃবৃন্দ, আলেম, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্মানে আয়োজিত এ ইফতার মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন পার্টির আমির আল্লামা সারোয়ার কামাল আজিজী এবং সঞ্চালনা করেন যুগ্ম মহাসচিব ডা: মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস খান। স্বাগত বক্তৃতা করেন, পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার।
আরো উপস্থিত ছিলেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব:) অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, এনসিপির সদস্যসচিব মো: আখতার হোসেন এমপি, ড. মাওলানা ঈসা শাহেদী, মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসান, মাওলানা ইউসুফ সাদেক হক্কানী, ড. খলিলুর রহমান আল-মাদানী, মেজর (অব:) আবদুল ওহাব মিনারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
নারী দিবসের শুভেচ্ছা : জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ পাবে; কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও বেতন বৈষম্য দূর হবে এবং সমাজের প্রতিটি নারী নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করতে পারবে।
গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেসবুকের নিজের ভেরিফাইড পেজে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বের সব নারীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে আরো লেখেন, নারীর প্রতি সহিংসতা, হয়রানি ও অবমাননার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। একই সাথে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। আমরা বিশ্বাস করি- নৈতিকতা, মানবিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজই নারীর প্রকৃত মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারে। ধর্ম, মত ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নারী আমাদের সম্মান ও সহযোগিতার দাবিদার। এটিই মহান আল্লাহ তায়ালার বিধান।
বিরোধী দলীয় নেতা আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি নারী নিরাপদ, সম্মানিত ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে পারে। সকল নারীকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।



