সৌদিগামী কর্মীরা ‘কফিল’ ভিসাতেই হচ্ছেন সর্বস্বান্ত

যেসব বাংলাদেশী শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে পাড়ি জমাচ্ছেন তাদের শতকরা ৯০ ভাগই আত্মীয়স্বজনের সংগ্রহ করা ভিসায় যাচ্ছে। মূলত এসব ভিসায় পাড়ি জমানো কর্মীদের বেশির ভাগই দেশটিতে যাওয়ার পর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই কাজ পাচ্ছেন না, ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে খালি হাতে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

মনির হোসেন
Printed Edition

  • খালি হাতে দেশে ফিরেছে অর্ধশত

  • টাস্কফোর্সে অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে ৬০ দিনে

বাংলাদেশ থেকে যেসব বাংলাদেশী শ্রমিক ভিসায় সৌদি আরবে পাড়ি জমাচ্ছেন তাদের শতকরা ৯০ ভাগই আত্মীয়স্বজনের সংগ্রহ করা ভিসায় যাচ্ছে। মূলত এসব ভিসায় পাড়ি জমানো কর্মীদের বেশির ভাগই দেশটিতে যাওয়ার পর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই কাজ পাচ্ছেন না, ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। এক পর্যায়ে টিকতে না পেরে খালি হাতে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এসেই তারা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও তাদেরকে গ্রামের যেসব দালালরা ভুলভাল তথ্য দিয়ে পাঠিয়েছিল তাদের নামে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে দিচ্ছেন অভিযোগ। কখনো, কখনো কর্মীরা অভিবাসন ব্যয়ের বাড়তি টাকা উদ্ধারে থানা পুলিশের শরণাপন্নও হচ্ছেন।

এদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ‘অভিযোগ সেলে’ যেসব কর্মীর তদন্তের পরও অভিযোগের কোনো সুরাহা করা যাচ্ছে না তাদের অভিযোগগুলো সুপারিশসহ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট সেলে পাঠানো হচ্ছে। এরপর সর্বোচ্চ ৬০ দিন অথবা আরো কম সময়ের মধ্যে বিদেশগামী অথবা বিদেশফেরত প্রতারিত কর্মীদের সমস্যা (সেবা) সমাধান করে দেয়া হচ্ছে নতুবা এজেন্সির বিরুদ্ধে নানা ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে টাস্কফোর্স সেলের প্রধান যুগ্মসচিব এ জেড এম নুরুল হক নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন।

গতকাল ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন সৌদি আরব থেকে প্রতারিত শ্রমিকরা দেশে ফেরত আসছেন। এদের মধ্যে জেলফেরত এবং আউটপাসে আসা কর্মীর সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়াও রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কাতার, ওমান, ইউএই এবং মালয়েশিয়া থেকেও প্রতারিত শ্রমিকরা দেশে ফিরছেন।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনালের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, মঙ্গলবার সৌদি আরব থেকেই ৩৬ জন পুরুষ কর্মী দেশে ফেরত এসেছে। এ ছাড়াও এদিন ইউএই থেকে একজন, মালয়েশিয়া থেকে ৯ জন, কাতার থেকে একজন ও ওমান থেকে একজন ফেরত এসেছে। এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার জেলখানা থেকে ১৬ জন, সৌদি আরব থেকে ১৪ জন মহিলা, রাশিয়া থেকে ৪৫ জন, সিঙ্গাপুর থেকে একজন, ব্যাংকক ও সৌদি আরবের দাম্মাম থেকে এক প্রতারিত কর্মী ফেরত এসেছে। এভাবে প্রতিনিয়ত বিদেশ থেকে প্রতারিত কর্মীরা খালি হাতে দেশে ফেরত আসছেন। দেশে ফেরত আসা কারো কারো বিরুদ্ধে পালিয়ে এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানিতে চলে যাওয়া অথবা কোন দোকান, বাসাবাড়িতে বেশি বেতনের আশায় কাজে যোগ দেয়ার অপরাধ ছাড়াও আকামা জটিলতার কারণে তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে যাচ্ছে। গতকাল জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অভিযোগ সেলের প্রধান উপপরিচালক মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। যার কারণে তার দফতরে প্রতারিত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছে সেই তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, জনশক্তি ব্যুরোর পরিচালক (কর্মসংস্থান) তানজিল্লুর রহমানেরও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কাকরাইলের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নয়া দিগন্তের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে সৌদি আরবের শ্রমবাজারের বেহাল অবস্থা জানিয়ে বলেন, এই মুহূর্তে আমার জানা মতে সৌদি আরবে যত কর্মী যাচ্ছে তাদের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ ভালো আছে। বাকি ৫০ ভাগের মধ্যে ৩০ ভাগ সমস্যার পরও টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে। আর উপায় না পেয়ে ২০ ভাগ শ্রমিক দেশেই চলে আসছে।

এসব কর্মীর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই ‘কফিল ভিসায়’ গিয়েছে (আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহ করাকে কফিল ভিসা বলে)। তিনি বলেন, আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছে মাত্র ১০ ভাগ কর্মী। যার বেশির ভাগ কোম্পানি ভিসায়। কোম্পানি ভিসায় প্রতারিত হওয়ার সংখ্যা কম দাবি করে তিনি বলেন, আমরা যারা কফিল ভিসা প্রসেস করে থাকি তারা প্রতি কর্মীর জন্য সরকারি খরচসহ সার্ভিস চার্জ ১২ হাজার টাকা নিয়ে থাকি। কিন্তু যখন কোন কর্মী দেশে ফেরত এসে অভিযোগ দিচ্ছে তখন কিন্তু এজেন্সির লাইসেন্সের নামেই অভিযোগ দিচ্ছে। কারণ প্রসেসিং আমাদের লাইসেন্সের নামে হয়। কখনো কখনো দালালের নামও উল্লেখ থাকে। এ নিয়ে আমাদের রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের প্রতিনিয়ত জনশক্তি ব্যুরোতে ডেকে নিয়ে হয়রানি করা হয়। একই কাজ করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সদস্যরাও। তাদের চাপের কারণে অনেক সময় আমরা অন্যায় না করেও সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা দিতে বাধ্য থাকি। কারণ কর্মী যাওয়ার সময় ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা দিয়ে যায়। সেখানে এসব তথ্য উল্লেখ থাকে। নতুবা লাইসেন্স বাতিল অথবা আমাদের সার্ভার লকড করে দেয়া হয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শ্রমিকরা যদি বিএমইটির ওয়ানস্টপের মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ যায় তাহলে তাহলে তাদের প্রতারিত হওয়ার ঘটনা অনেক কমে আসবে। কারণ সৌদি আরবের মালিকরা দুই-তিন হাজার রিয়াল খরচ করে একটি ‘কফিল ভিসা’ বের করে। কিন্তু দেখা যায় সেই ভিসায় কোনো কাজ নেই। তখনই কর্মীরা সমস্যায় পড়েন। এসব ভিসা আবার কর্মীদের আত্মীয়স্বজনরাই তাদের মালিকের কাছ থেকে হাতে পায়ে ধরে সংগ্রহ করেন। তিন মাসের আকামা থাকায় এসব ভিসার মেয়াদ শেষেই কর্মীদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তখনই শুরু হয় বিপদ।

গতকাল মঙ্গলবার কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট বিভাগের প্রধান যুগ্মসচিব এ জেড এম নুরুল হক বিদেশগামী কর্মীদের অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা কর্মীদের অভিযোগগুলো দুই ভাবে নিষ্পত্তি করে থাকি। এজেন্সি মালিক এবং কর্মীকে ডেকে এনে সালিশের মাধ্যমে, আরেকটি হচ্ছে অভিবাসন আইন অনুযায়ী। এসব অভিযোগের সুরাহা কি ৬০ কার্যদিবসে করা হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবসের উল্লেখ থাকলেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহেও নিষ্পত্তি করে ফেলি। এরপরও যাদেরটা নিষ্পত্তি হয় না, প্রয়োজনে ওই এজেন্সির মালিকের লাইসেন্স বাতিল নতুবা সার্ভার লকড করে দিচ্ছি। তবে সালিশের মাধ্যমেই কর্মীরা বেশি সমাধানে আগ্রহী হয় বলে জানান তিনি।