আসছে নতুন মুদ্রানীতি : ব্যাংক খাতে কতটা স্থিতি আনবে

নতুন মুদ্রানীতিতেও আগের মতোই সঙ্কোচনমুখী নীতির ধারা বজায় রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য ধরে নীতি সুদের হার, ঋণপ্রবাহ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থান নেয়া হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সঙ্কট সমাধান করা সম্ভব নয়।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর আস্থার সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক ব্যাংক রেজুলিউশন সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের আসন্ন নতুন মুদ্রানীতি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে- এই নীতি কি আদৌ ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতিতেও আগের মতোই সঙ্কোচনমুখী নীতির ধারা বজায় রাখার ইঙ্গিত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য ধরে নীতি সুদের হার, ঋণপ্রবাহ এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থান নেয়া হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সঙ্কট সমাধান করা সম্ভব নয়।

ঋণখেলাপি ও দুর্বল ব্যাংকের বোঝা : বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বৃহৎ ঋণখেলাপি ও পুনঃতফসিলনির্ভর ব্যবসায়িক মডেল। বছরের পর বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় এস আলম, বেক্সিমকো, শিকদার, নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপসহ কিছু বড় গ্রুপ হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে লুট করলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে চূড়ান্তভাবে বিক্রি করা হয়নি। সরকার থেকেও এসব বাজেয়াপ্ত সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা জমা রেখে তা ফেরত পাচ্ছেন না। বরং সম্প্রতি ‘রেজুলিউশন স্কিম’-এর মাধ্যমে লোকসানের দায় চাপানো হয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের ওপর, যা ব্যাংক ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই অবস্থায় নতুন মুদ্রানীতি যদি আবারো খেলাপিদের জন্য নমনীয় ঋণনীতি, বিশেষ সুবিধা বা গোপন প্রণোদনার পথ খুলে দেয়, তবে তা স্থিতিশীলতার বদলে সঙ্কট আরো গভীর করবে।

সুদের হার ও তারল্য ব্যবস্থাপনা : নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদের হার কিছুটা কমানো বা স্থিতিশীল রাখার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় রয়েছে, যাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে গতি আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাংকগুলো নিজেরাই তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। আমানত কমছে, মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। এই অবস্থায় সুদের হার কমালে ঋণ বিতরণ বাড়বে এই ধারণা অনেকটাই তাত্ত্বিক।

বরং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আস্থা ফেরানো ছাড়া কোনো মুদ্রানীতি কার্যকর হবে না। আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যাংক খাতে তারল্য ফেরানো সম্ভব নয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় প্রশ্ন : নতুন মুদ্রানীতির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সাহসের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে দায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপানোর কারণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই সাথে মুদ্রানীতি কঠোর দেখালেও বাস্তবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।

স্থিতির জন্য কী দরকার ? : বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে প্রকৃত স্থিতি আনতে হলে মুদ্রানীতির পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় জরুরি। প্রথমেই বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমানতকারীদের ক্ষতি পূরণে স্পষ্ট রোডম্যাপ ও ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আসন্ন মুদ্রানীতি স্বল্পমেয়াদে কিছু আর্থিক সূচকে শৃঙ্খলা আনতে পারলেও, ব্যাংক খাতের গভীর কাঠামোগত সঙ্কট সমাধানে এটি একা যথেষ্ট নয়। যদি নতুন নীতি আবারো পুরনো সমস্যাকে আড়াল করার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে স্থিতিশীলতার বদলে আস্থার সঙ্কট আরো ঘনীভূত হবে। এখন সময় অর্ধসমাধান নয়, বরং কঠোর ও ন্যায্য সংস্কারের।