- গডফাদাররা ঢাকায় বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে সীমান্ত
- বেকারত্ব দূর করার উদ্যোগ নেই যুব উন্নয়নে
- জামিন পাওয়ার পর নজরদারিতে রাখা যাচ্ছে না
দেশের সীমান্ত এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার মাদক কারবারি ও চোরাচালানির তালিকা করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গোয়েন্দা কার্যক্রমের উপর অনুসন্ধানের পর মাদক ও চোরাচালানিদের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই তালিকায় রয়েছে মাদকের গডফাদার থেকে শুরু করে চোরাচালানির সাথে যুক্তদের নাম। বিজিবি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মূলত সীমান্তের ওপার মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা মাদক-চোরাচালানিপণ্য দালাল (কেরিয়ার) হিসেবে চালানপ্রতি মাত্র ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায় কাজ করে থাকে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার গডফাদাররা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় বেকার ও দরিদ্র পরিবারের যুবকদের কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় তারা এই ভয়ঙ্কর চোরাচালানির পেশা বেছে নিয়েছে। সমাজকল্যাণ অধিদফতর ও যুব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সহায়তার অভাবে সীমান্ত এলাকায় বিপথগামী যুবকদের কর্মসংস্থানে ফেরানো যাচ্ছে না।
সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, বিপথগামী যুবকদের জন্য আলাদা কোনো বাজেট দেয়া হয় না। যেসব কিশোর ও কিশোরীদের জন্য তিনটি কারাগার রয়েছে তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব সমাজকল্যাণ অধিদফতরের।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং বিচিত্র। বিশেষ করে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারে আসছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও আইস। এই তিনটি রুটেই মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মাদক এই তিন রুট দিয়েই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। পাচারকারিরা রুট পরিবর্তন না করলেও কৌশল পরিবর্তন করে মাদকে সয়লাব করে তুলছে সারা দেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিকায়নের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক-সামাজিক চাপসহ নানান কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা-বিষণœতা ভর করছে। এর জেরে ঘটছে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে মাদকাসক্তিতেও ঝুঁকছেন অনেক তরুণ-তরুণী। দিন দিন অবসাদগ্রস্ত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বাড়ছে মাদকের চাহিদা। সেই চাহিদার জোগান দিতে বাড়ছে চোরাচালানও। এই চাহিদার প্রয়োজন মেটাতেই মাদকের ধরনও পাল্টাচ্ছে বছর বছর।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ২৯টি সীমান্তবর্তী জেলার প্রায় ১৬২টি রুট দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। এর বাইরে সাগর পথে এবং আকাশ পথেও মাদকের চোরাচালান আসছে। তার মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া এবং সাগরপথ দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা ও আইস। অপর দিকে ফেনসিডিলের চালান চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং যশোরের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে। এ ছাড়াও হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকের রুট হিসেবে ট্রানজিট পয়েন্ট ধরা হয়েছে রাজশাহীর গোদাগাড়ি ও চুয়াডাঙার দশমিনা। সিলেটের সীমান্তের ওপারের আসাম থেকে আসে গাঁজা। ওই গাঁজা রেলপথে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হয়। ওই সূত্র জানায়, সীমান্তে যুব সমাজ দারিদ্রতার কারনে এই ভয়ঙ্কর পথ বেছে নিয়েছে। তারা ওপার থেকে এপারে মাদক পাচারের জন্য মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় কোটি টাকার মাদক এনে গডফাদারদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। সীমান্তে বেকার যুবকদের জন্য বৈধভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে তারা এই বিপথগামী পথ থেকে বেরিয়ে আসবে বলে স্বজনরা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালক (পরিকল্পনা) উপসচিব মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় বেকারত্ব দূর করার লক্ষ্যে অন্তবর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে প্ল্যানিং সভায় কয়েক দফা ফাইল উত্থাপন করেছি।
এ প্রসঙ্গে সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক (গবেষণা, মূল্যায়ন, প্রকাশনা ও জনসংযোগ) মোহাম্মদ রেজাউর রহমান বলেন, মাদক বা অন্যন্য অপরাধের সাথে যেসব কিশোর-কিশোরী গ্রেফতার হয়ে কিশোর কারাগারে আসে তাদের দেখভাল করার দায়িত্ব আমাদের। তিনটি কিশোর-কিশোরী কারাগারে আটক থাকা বিপথগামীদের আলোর পথে ফেরানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালানো হয়। তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারা যেন মাদকের সাথে সম্পৃক্ত না হয় সে বিষয়গুলো তাদের ভালোভাবে বোঝানো হয়। আমরা এর সুফলও পেয়েছি।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতি মাসে মাদক ও চোরাচালানিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে মাদক আসায় আমরা গ্রেফতারের পরও সুফল পাচ্ছি না। যখনই পুলিশ খবর পাচ্ছে তখনই মাদক কারবারিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। যাদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হচ্ছে তারা আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিনে বেরিয়ে আগের নম্বর ও মোবাইল সেট পরিবর্তন করে মাদক কারাবারে কৌশল বদলে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে মাদক আনছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কারবারিরা এখন কৌশল পাল্টে মাদক পাচার করছে। সম্প্রতি এক মাদক ব্যবসায়ীকে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিজিবি সদস্যরা। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মাদক কারবারি বলেন, তারা প্রথমে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে জঙ্গল বা পুকুরে ফেলে দেন মাদক। এরপর সময়-সুযোগ বুঝে তারা সেখান থেকে মাদক পাচার করে থাকেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সীমান্তে কঠোর হওয়ার কারণে তারা কৌশল পাল্টেছে।
তদন্ত সংম্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইয়াবা মূলত মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রধান রুট হিসেবে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া ইয়াবা প্রবেশের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট। নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে ট্রলারে করে বড় বড় চালান দেশে ঢোকে। বিকল্প রুট হিসেবে সম্প্রতি টেকনাফে নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করেছে। বর্তমানে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রথমে ভারতের ত্রিপুরা ও আসাম হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামের রৌমারী-মানকাচর সীমান্ত দিয়েও ঢুকছে। পাচারকারীরা ফল, চাল বা সারের বস্তা ও হলুদ-মরিচের বস্তার ভেতর লুকিয়ে, মাছ ধরার ট্রলারে করে অথবা স্থানীয় ও রোহিঙ্গা বাহকদের মাধ্যমে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে মাদক বহন করে। এমনকি ইয়াবা কারখানার অবস্থান এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (কোচবিহার ও ২৪ পরগনা), আসাম ও মেঘালয় সীমান্তেও শনাক্ত হয়েছে।
গতকাল ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো: সরওয়ার বলেন, ঢাকা মহানগরীতে মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।


