২০২৪ সালের ৩১ জুলাই- বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত দিনে পরিণত হলো। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, গুম, গ্রেফতার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে পালিত হয় ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি। তবে পুলিশের দমন-পীড়নের মুখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ব্যর্থ করে দেয়া হয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটসহ অন্তত ছয়টি বিভাগীয় শহরে পুলিশের লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় বিক্ষোভকারীরা। গ্রেফতার করা হয় শতাধিক শিক্ষার্থী। অন্তত ৯০ জন আহত হন, যাদের মধ্যে সাংবাদিকও রয়েছেন।
ঢাকায় কেন্দ্রস্থলে সংঘর্ষ : বুধবার দুপুর ১২টা থেকে হাইকোর্টের মাজার গেট এলাকায় জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। সাড়ে ১২টার দিকে শুরু হয় প্রথম দফা গ্রেফতার। এরপর টানা তিন ঘণ্টা অবস্থান করে স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমান, আইনজীবীসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দোয়েল চত্বর ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও অবস্থান ও সমাবেশ হয়।
অন্যান্য শহরেও দমন : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে বিক্ষোভ মিছিল ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালিত হয়। সিলেটে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে। আহত হন অন্তত ২০ জন।
কর্মসূচির পরবর্তী ধাপ : বৃহস্পতিবারের জন্য ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ নামে স্মরণ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে আন্দোলনকারীরা। শহীদ ও আহতদের স্মৃতিচারণ, চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিতি, ফেস্টুন ও ডিজিটাল পোর্ট্রেট তৈরির ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠিতে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরাপত্তা খাতের সংস্কার দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বেন কার্ডিন ও কোরি বুকার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানান।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিঘাত : শিক্ষার্থী নির্যাতনের প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ঊট) বাংলাদেশে নতুন অংশীদারিত্ব চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রথম ধাপ স্থগিত করে। একই সময়ে শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সহিংসতাকারীদের ‘শ্রীলঙ্কার-মতো ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রশাসনিক রদবদল : পুলিশি দমন-পীড়নের মূল চরিত্র ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন মহা. আশরাফুজ্জামান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেয়া : ১৪ দিন পর ৩১ জুলাই বিকেলে চালু হয় ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
ব্যাপক ধরপাকড় : বিক্ষোভ শুরুর পর ১৫ দিনে সারা দেশে গ্রেফতার হন ১০ হাজার ৭৩৫ জন। শুধু ঢাকায় গ্রেফতার হন দুই হাজার ৯৫০ জন। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় আরো ৩৪১ জন।



