আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট। তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন, ভোটের সমীকরণ ও জয়ের হিসাবেই ব্যস্ত। প্রার্থীরাও মাঠে নেমেছেন দলীয় প্রতীকে ভোট চাওয়ায়; কিন্তু দীর্ঘ সংলাপের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকরে যে গণভোট, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো নয়।
গণভোটে ভোটারদের সামনে থাকবে একটিমাত্র প্রশ্ন- ‘হ্যাঁ’ না ‘না’। সংস্কারের পক্ষে রায় দিতে হলে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট হলেও দলগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জোরালো প্রচারণা নেই। বিশেষ করে বড় দল বিএনপি কার্যত নিশ্চুপ। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র-জনতার নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল নিজ প্রতীকে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বললেও তা সীমিত পরিসরেই রয়ে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। জাতীয় নির্বাচন আয়োজন, প্রার্থী যাচাই-বাছাই ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ইসির ব্যস্ততা দৃশ্যমান হলেও গণভোট নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে ইসি সচিব- কারো সাম্প্রতিক বক্তব্য নেই। একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন নিয়ে শুরুতে চ্যালেঞ্জের কথা বলা হলেও প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা আসেনি।
সরকারের পক্ষ থেকেও গণভোটকে ঘিরে ব্যাপক জনসচেতনতা চোখে পড়ছে না। গত ২২ ডিসেম্বর ভোটার সচেতনতা তৈরিতে ১০টি ‘ভোটের গাড়ি- সুপার ক্যারাভান’ যাত্রা শুরু করে। ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ভোটাধিকার কারো দয়া নয়; এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।’ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও গণযোগাযোগ অধিদফতরের যৌথ উদ্যোগে গান, ডেমো ভোট ও রঙিন ব্যালট ব্যবহারের কথা বলা হলেও এখনো তা বড় আকারের প্রচারণায় রূপ নেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রথম একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ভিত্তি হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। আদেশের ১৫টি অনুচ্ছেদের মধ্যে আটটি কার্যকর হলেও বাকি সাতটি কার্যকর হবে কেবল গণভোটে জনগণের অনুমোদন মিললে। ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণভোট এমন একটি নির্বাচন, যেখানে জনগণ ঠিক করে দেবে আগামী দিনে দেশ কিভাবে চলবে। দেশ পরিচালনার পথ নির্ধারণ করবে এই ভোটের ফলাফল।’
ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে রাজনৈতিক ঐক্য বাস্তবায়নের একমাত্র পথ গণভোট। তবে গণভোট নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। ভোটের ভাষা জটিল, সময় সীমিত, কেন্দ্রীয় সমস্যায় গণভোট স্থগিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। পাশাপাশি জুলাই সনদের একাধিক প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকায় ঐক্য প্রশ্নবিদ্ধ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ইশতেহারে স্পষ্ট করা- তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোটের পক্ষে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, ‘‘আমরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে পারি না। তাতে আমাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের সমর্থকদের বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবে। তারা ‘না’ ভোট দিলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। এ অবস্থায় জুলাইপন্থী দলগুলোর পাশাপাশি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সমন্বিত ও জোরালো জনসচেতনতা ছাড়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।



