পাহাড়কে অশান্ত করতে মরিয়া আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • গোলাগুলিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি
  • প্রতিবেশী দেশের অস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ ও জেএসএসের কাছে
  • ১৮ দিনে হাজার হাজার গোলাবারুদের ব্যবহার
  • নেপথ্যে চাঁদাবাজি-দখলবাজি নিয়ন্ত্রণ

আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর তৎপরতায় দেশের পার্বত্য অঞ্চল ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে চাঁদাবাজি-দখলবাজি নিয়ন্ত্রণে নিতে পরিকল্পিতভাবে পাহাড়কে অশান্ত করতে এরই মধ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-মূল) মধ্যে দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। গত ১ মার্চ থেকে শুরু হওয়া দুই পক্ষের গোলাগুলির শব্দ গতকাল পর্যন্ত শুনতে পেরেছেন রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির বাসিন্দারা। এতে করে পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানে বসবাসরত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো ভারী আগ্নেয়াস্ত্র প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে চোরাইপথে এনে শান্তির পাহাড়কে অশান্ত করতে ফের চক্রান্তে লিপ্ত। এর নেপথ্যে আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।

গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর মারমা সম্প্রদায়ের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে খাগড়াছড়ি শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় টানা কয়েক দিন ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলো।

একপর্যায়ে প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাগড়াছড়ির গুইমারা এলাকায় ব্যাপক সঙ্ঘাত হয়। এতে তিনজন পাহাড়ি বাসিন্দা নিহত এবং ১৩ জন সেনা ও তিনজন পুলিশ সদস্যসহ আরো অনেকে আহত হয়েছেন বলে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ১৮ দিনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ এবং জেএসএস হাজার হাজার গোলা ব্যবহার করেছে। এ সময় গুলিতে একজনের মৃত্যু ও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গতকাল বুধবারও দুই জেলার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মধ্যে গুলির আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন।

ওই সূত্রগুলো জানায়, গত ১ মার্চ বেলা আড়াইটা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার বান্দরশিং এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ৩ মার্চ বিকেল সোয়া ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত একই এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ৪৩০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ৫ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে সোয়া ৮টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলাধীন পানছড়ি উপজেলার গঙ্গাপাড়া ও বড়কোনা এলাকা জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ১০০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। গত ৭ মার্চ দুপুর ১২টা ৫০ থেকে বেলা ১৩টা ২০ মিনিট পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলাধীন পানছড়ি সাব-জোনের জোগাপাড়া ও বরকলোনা এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফ (মূল) এর সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ১২০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। এতে ইউপিডিএফ (মূল) এর একজন নিহত এবং দুইজন আহত হয়।

গত ৮ মার্চ বেলা দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত রাঙ্গামাটি জেলাধীন লংগদু উপজেলার সিদ্রাবাদ এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ১০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ৯ মার্চ বেলা সোয়া ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের কজইছড়ি পাড়া, করলসাপ পাড়া, দুলদুলিয়া পাড়ায় অবস্থিত একটি পাহাড়ে জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ৮০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ১৩ মার্চ বিকেল ৫টা ৫০ মিনিট থেকে রাত আনুমানিক ৮টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলাধীন মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ১২০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ১৪ মার্চ বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ২৫০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়।

গত ১৫ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত খাগড়াছড়ি জেলাধীন পানছড়ি উপজেলার জোগাপাড়া ও করল্লাছড়ি এলাকায় জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে আনুমানিক ২৬০ রাউন্ড গুলিবিনিময় হয়। গতকাল পর্যন্ত স্থানীয়রা কয়েক দফা গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং বড় পরিকল্পনার অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই ষড়যন্ত্র হয়ে আসছে। সীমান্তের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন পক্ষ এখানে তৎপর। ইউপিডিএফ বা জেএসএসসহ অন্য যারা আছে তারা পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে মাত্র, তাদের সব কিছুই সীমান্তের বাইরে থেকে পরিচালিত হয়।

পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সবাই আমাদের লোক, তারা সবাই বাংলাদেশী। কেউ আমাদের শত্রু নয়। কিন্তু কিছু মানুষ (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর) আছে, যারা উসকানি ও গুজবে নাচতে থাকেন। এখানে ছোট কিছু গ্রুপ আছে, যারা পরিকল্পিতভাবে পাহাড়কে অশান্ত করতে সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টায় লিপ্ত।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইউপিডিএফ (মূল) উসকানিতে গত বছর খাগড়াছড়িতে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা পার্বত্য অঞ্চলের অন্য সংগঠন জেএসএসসহ (মূল) আরো অনেককে একতাবদ্ধ হয়ে সেনাবাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা দেশী-বিদেশী অস্ত্র সরঞ্জামের মজুদ বাড়াচ্ছে।

গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলায় ‘জুম্ম ছাত্র জনতা’র ব্যানারে মহাসমাবেশের সময় গুজব ছড়িয়ে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। এতে তিনজন সেনাসদস্য আহত হন। পর দিন ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় খাগড়াছড়িতে সড়ক অবরোধের সময় ইউপিডিএফের গুলিতে একটি টমটম গাড়ির চালক আহত হন। এ ছাড়া আলুটিলা পুনর্বাসন এলাকায় একটি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করা হয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলার সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। গুইমারায় ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে ডিআইজি ও সদস্য র‌্যাবের মহাপরিদর্শক অতিরিক্ত আইজি মো: আহসান হাবীব পলাশ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, পাহাড়কে অশান্ত করতে আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যরা তৎপর রয়েছে, যেন কোনো বড় ধরনের অঘটন না ঘটাতে পারে।