ফকল্যান্ড ইস্যু কি অনুপ্রেরণা হবে আর্জেন্টিনার

Printed Edition

‘ফাইনালে ইংল্যান্ডকে পেলে খুশি হতাম। তাহলে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে মাঠে নামা যেত।’ ঘটনাটা ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের। আর্জেন্টিনা যখন ফাইনালে ইংল্যান্ডের বদলে পশ্চিম জার্মানিকে পেল তখন এই বলে সংবাদ সম্মেলনে আফসোস করেছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। এই আফসোসই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হাতাশায় পরিণত হয়েছিল কার্লোস বিলার্দোর দলের জন্য। কারণ সেই ফাইনালে মেক্সিকান রেফারি কোডেসালের বিতর্কিত পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনাকে হারতে হয়েছিল। ফাইনালের আগে ম্যারাডোনা ফকল্যান্ড ইস্যু সামনে এনেছিলেন এ কারণে, ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার পূর্বে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে ৭৪ দিনের যুদ্ধ হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে। আর্জেন্টিনার এই দ্বীপ আগেই দখল করে নিয়েছিল ইংল্যান্ড। পরে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা সরকার এই দ্বীপ ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল পুনর্দখল করে। পরে ব্রিটিশ বাহিনী আট হাজার কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ফকল্যান্ড গিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয় আর্জেন্টিনার সাথে। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা যুদ্ধে হেরে আত্মসমর্পণ করে চলে আসে ফকল্যান্ড ছেড়ে।

ইংল্যান্ডের সাথে এই ইস্যু নিয়ে আর্জেন্টিনার বিরোধ সেই ১৮৪১ সাল থেকেই। যখন ব্রিটিশ সরকার দখলে নেয় এই দ্বীপটিকে। এরপর সেখানে ব্রিটিশদের নিয়ে বসবাস করানো শুরু করে। ১৯৮২ সালের যুদ্ধে হারের দুঃসহ স্মৃতি আজও ভুলতে পারছে না আর্জেন্টাইনরা। তাই ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারানোর পর ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘এটা ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের প্রতিশোধ।’

ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের প্রভাব ১৯৮২ সালের যুদ্ধে পড়েছিল আর্জেন্টিনা দলের ওপর। যুদ্ধের কয়েক দিন পরই ছিল বিশ্বকাপ। ফলে আগের বারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ১৯৮২-এর স্পেন বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়ে। সেই দলের ফুটবলার আর্দিলেসের ভাই ছিলেন আর্জেন্টিনা বিমানবাহিনীর সদস্য। ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্দিলেসের ভাই প্রাণ দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে।

ইংল্যান্ডকে খেলার মাঠে প্রতিপক্ষ হিসেবে পেলেই আর্জেন্টাইনরা সামনে নিয়ে আসে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই স্মৃতি। এই বিশ্বকাপেই মিসরকে সেরা ১৬-এর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে হারিয়ে সেরা ৮-এ ওঠে। এরপর ড্রেসিং রুমে ফিরেই আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের দল বেধে কাঁধে হাত রেখে এক সুরে গাইতে থাকে গান। ‘লাস মালভিনাসের সেই তরুণদের আমরা কখনোই ভুলব না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমি আর্জেন্টিনারই। মালভিনাসের জন্য, দিয়েগোর (ম্যারাডোনা) জন্য এবং লিওর (মেসি) শেষ অধ্যায়ের জন্য।’ অর্থাৎ মেসির শেষ বিশ্বকাপটা হোক ট্রফি জিতেই। উল্লেখ্য, আর্জেন্টাইনরা ফকল্যান্ডকে মালভিনাস বলে। মেসিরা ধরেই নিয়েছিল তারা সেমিতে পাবে ইংল্যান্ডকে। তাই ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সৈনিকের স্মরণে ‘মুসাসোস’ এই শব্দ দিয়ে গান গাওয়া শুরু করে। ফিফা অবশ্য এই রাজনৈতিক গান গাওয়া বিষয়ে আর্জেন্টিনা দলের বিপক্ষে তদন্ত করেছে। তবে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। উল্লেখ্য, মাঠে বা ড্রেসিং রুমে খেলোয়াড়দের এমন রাজনৈতিক গান ফিফা পছন্দ করে না।

এই ফকল্যান্ড ইস্যুতে উদ্দীপ্ত হয়ে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডেও ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল তারা। দিয়েগো সিমিয়নেক পা দিয়ে অযথা গুঁতা দিয়ে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়ার সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার টাইব্রেকারে জয়। নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২-এ শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে গোলরক্ষক কার্লোস রোয়ার দুই শট সেভে জিতেছিল কোচ ড্যানিয়েল প্যাসারেলার দল।

অবশ্য সব সময়ই যে ফকল্যান্ড ইস্যু ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাফল্য এনে দিয়েছে, তা নয়। বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর্জেন্টিনা তিনবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। প্রথম দুইবার ১৯৫৪ ও ১৯৬২ সালে। আর ১৯৭৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতার পর একবার। তা এই শতাব্দীর শুরুতে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে। ২০০২ সালের ওই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিদায়টা ত্বরান্বিত হয়েছিল গ্রুপ পর্বে ইংল্যান্ডের কাছে ০-১ গোলে হারের পর। সেই আসরে মার্সেলো বিয়েলসার দল প্রথম ম্যাচে নাইজেরিয়াকে ১-০ গোলে হারালেও পরের ম্যাচে জাপানের সাপ্পোরোতে ইংলিশদের কাছে মাথানত। শেষ ম্যাচে তাদের জয়ের বিকল্প ছিল না সুইডেনের কাছে। কিন্তু ১-১ গোলে ড্র করে বিদায় নিতে হয় গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, হার্নান ক্রেসপো, ক্লাউডিও লোপেজদের।

২০০২ সালে আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বে বিদায়টা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। ল্যাটিন জোনে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সবার ওপরে থেকে জাপান-কোরিয়ায় খেলার টিকিট পেয়েছিল। তাদের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন ভাবা হয়েছিল। অথচ দেশে ফিরতে হয়েছিল গ্রুপে চার দলের মধ্যে তৃতীয় হয়ে।

এবার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা সম্ভাব্য শিরোপা জয়ী। সাথে নামের পাশে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন খেতাব তো আছেই। এখন লিওনেল স্কালোনির দল কি পারবে ফকল্যান্ড ইস্যুতে দলকে আত্মবিশ্বাসী করতে ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে যেতে?