ব্যবসা ছাড়াবে হাজার কোটি টাকা পর্যটন খাতে সম্ভাবনার মধ্যেও শঙ্কা

আবুল কালাম
Printed Edition

ঈদ ঘিরে সারা দেশে পর্যটকদের ঢল নামার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসা ছাড়াতে পারে হাজার কোটি টাকা। এ জন্য দেশের প্রায় দেড় হাজারের বেশি পর্যটন স্পট প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় শতাধিক স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নির্বিঘেœ ঘুরতে পারেন সে জন্য মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার টুরিস্ট পুলিশ। বিশেষ করে অধিক সমাগমের স্থান কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, পার্বত্য এলাকা ও হাওরাঞ্চলে নিরাপত্তা তুলনামূলক বেশি জোরদার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ব্যাপক পর্যটক সমাগমে ব্যবসা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও শঙ্কাও রয়েছে। তাদের ভাষ্য, শীত শেষে এখন আবহাওয়াতে পরিবর্তন হচ্ছে। আওহাওয়া অফিস বলছে ঈদের সময় ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। যদি তাই হয় তবে পর্যটক সমাগম প্রত্যাশা অনুযায়ী না-ও হতে পারে। অন্য দিকে এবার জ্বালানি তেলের সঙ্কটে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমতে পারে। যার বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পর্যটন খাতে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, দেশে এক হাজার ৬৭৫টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে যেসব স্পটে জনসমাগম বেশি হয়, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ রকম ৩৩ জেলার ১০৭ পর্যটন স্পটে পর্যটকের নিরাপত্তায় থাকবে প্রায় দেড় হাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ। এরইমধ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতর থেকে সব রিজিয়ন অফিসে ২০ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অপরাধীরা যেন কোনো ধরনের নাশকতা বা চুরি, ছিনতাই এবং ডাকাতি করতে না পারে সে জন্য পর্যটন এলাকায় দিনে ও রাতে পুলিশ প্যাট্রলিং জোরদার নিশ্চিত করা হয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে কক্সবাজারের ৫০০টির বেশি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। তাদের ধারণা ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন অন্তত লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করবেন। এতে পর্যটন খাতে ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভালো রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি ও গোয়েন্দা টিম মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি টিম পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, নির্বাচনের আগে ও রমজানে পর্যটক কম থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় ঈদে পর্যটকের চাপ বাড়বে। এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পর্যটক আসবে বলে তাদের প্রত্যাশা। তিনি বলেন, ঈদের সাত থেকে আট দিনের ছুটিতে কুয়াকাটায় উপচে পড়া ভিড় হতে পারে। ইতোমধ্যে ভালো মানের হোটেলগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়েছে।

বান্দরবান রেসিডেন্সিয়াল হোটেল ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। সামনে আরো কয়েকদিনে বুকিং আরো বাড়বে। তিনি বলেন, বান্দরবানে হোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসাথে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে।

সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স গ্রুপের সাবেক সভাপতি সুমাত নূরী চৌধুরী জুয়েল জানান, ঈদের দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত সিলেট। দীর্ঘ দিন স্থবির থাকা পর্যটন খাত আবারো চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি এবার শতকোটি টাকার ব্যবসার আশাও করছেন তারা। একই সাথে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জাফলং, সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের টাংগুয়ার হাওরে ব্যাপক সমাগম ঘটবে বলে তাদের ধারণা। এতে শত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।

অন্য দিকে শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ বলেন, ঈদুল ফিতরের ছুটিকে সামনে রেখে শ্রীমঙ্গলে মোটামুটি ভালো পর্যটক সমাগম হবে। এ নিয়ে তারা ব্যাপক প্রস্ততি নিয়েছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী জানান, পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি থাকছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো: কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে টহল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিকভাবে চালু থাকবে। জেলা পুলিশের সমন্বয়ে উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি যৌথভাবে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। যাতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকেরা নির্বিঘেœ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে বিষয়ে আমাদের সর্বোচ্চ নজর রয়েছে।

ঈদের টানা ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত হয়েছে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন নয়নাভিরাম পাহাড় লেকে ঘেরা পর্যটন স্পট। এবার ঈদে একটানা সাত দিন ছুটি থাকায় পর্যটন শহর হিসাবে খ্যাত কাপ্তাইয়ে হাজারো পর্যটকের আগমন ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

অন্য দিকে রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ইউনিট ব্যবস্থাপক (উপ-ব্যবস্থাপক) আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটদের বরণে কোনো প্রস্তুতির কমতি রাখা হয়নি। সবকিছু ঢেলে সাজানো হয়েছে। পর্যটকরা যাতে সুন্দর পরিবেশে ঘুরে বেড়াতে পারে তার জন্য সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় প্রস্তুত ট্যুরিস্ট পুলিশ বলছে, ঈদকে সামনে রেখে রাঙামাটিতে নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে দূর-দূরান্তের আগত পর্যটদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়ন থাকবে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে, আর মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ অবস্থান করছে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে। এর ফলে গত দু’দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যা আরো অন্তত পাঁচ দিন চলবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। সেই সাথে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। এই সময়ে সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আগামী রোব, সোম, মঙ্গল ও বুধবারও বৃষ্টিপাতের এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী নয়া দিগন্তকে বলেন, এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বেশি হবে। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেটসহ অন্যান্য জনপ্রিয় স্পটে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়বে। তবে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট শিডিউলে অনিশ্চয়তা থাকায় বিদেশী পর্যটক বাংলাদেশে আসছেন না, দেশের মানুষও কম যাচ্ছেন বিদেশে। এবার হাজার কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে শঙ্কাও রয়েছে। যদি আবহাওয়া ভালো না হয় হবে তার বড় নেতিবাচক প্রভাব পর্যটনে পড়বে। অন্য দিকে জ্বালানি সঙ্কটে প্রাইভেট অনেক গাড়ি চলবে না ফলে পর্যটকদের একটি বড় অংশ এখানে কমবে।